
মিশরের রাজধানী কায়রোতে প্রবাসী বাংলাদেশি ছাত্রদের জন্য এক স্মরণীয় ও আবেগঘন বিকেল উপহার দিয়েছেন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ড. মিজানুর রহমান আজহারী। তাঁর মিশর আগমন উপলক্ষে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মিশরীয় সময় বিকেল ৪টায় কায়রোর ওয়াটার ক্লাবে বাংলাদেশি ছাত্রদের সংগঠন ইত্তেহাদ–এর উদ্যোগে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ সংবর্ধনা ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় প্রেরণা, স্মৃতিচারণ ও দিকনির্দেশনামূলক আলোচনার এক অনন্য মিলনমেলায়।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে। তিলাওয়াত পরিবেশন করেন মাওলানা শোয়াইব আল-আজহারী। এরপর অতিথিকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন ইত্তেহাদের সভাপতি নেমান আজহারী। তিনি বলেন, ড. মিজানুর রহমান আজহারী আজহারি ছাত্রদের কাছে কেবল একজন জনপ্রিয় বক্তা নন; তিনি শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও আদর্শিক দৃঢ়তার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তাঁর জীবনাচরণ ও সংগ্রাম আজহারি ছাত্রসমাজকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়।
স্বাগত বক্তব্যের পর ইত্তেহাদের পক্ষ থেকে ড. মিজানুর রহমান আজহারীর হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় মূল আলোচনা। স্মৃতিচারণে ড. আজহারী আবেগঘন কণ্ঠে জানান, তিনি ২০০৮ সালে মিশরে আগমন করেন এবং আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ‘বুঊস’-এ অবস্থান করতেন। তিনি বলেন, আল-আজহারের হোস্টেল যেন দুনিয়ার বুকে এক টুকরো জান্নাত—ছাত্ররা ঘুম থেকে ওঠার আগেই সকালের নাস্তা প্রস্তুত থাকে, দুপুরের খাবারে বিলম্ব হয় না এবং মাস শেষ হওয়ার আগেই স্কলারশিপের ভাতা (মিনহা) ব্যাংক একাউন্টে পৌঁছে যায়।
তিনি আরও বলেন, আজও তিনি গভীরভাবে তাঁর মিশরের ছাত্রজীবন মিস করেন। কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলায় নিয়মিত অংশগ্রহণ ও বই সংগ্রহের স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে ইচ্ছা থাকলেও আগের মতো সময় ও সুযোগ আর হয়ে ওঠে না।
নিজের শিক্ষাজীবনের শিকড়ের কথা স্মরণ করে ড. আজহারী দারুননাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। মাদ্রাসার অধ্যক্ষের সঙ্গে এক স্মৃতিময় আলাপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তিনি একদিন হাসতে হাসতে বলেছিলেন—তুমি তো আমাকে বিপদে ফেলেছ, এখন সবাই আজহারী হতে চায়।”
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মিশরে বাংলাদেশি ছাত্রদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এক সময় যেখানে আজহারি ছাত্রের সংখ্যা ছিল মাত্র তিনশত, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় পাঁচ হাজারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে স্কলারশিপ ব্যবস্থার উন্নতির কথা উল্লেখ করে জানান, আগে যেখানে ভাতা ছিল ১০০ মিশরীয় পাউন্ড, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫০০ পাউন্ডে উন্নীত হয়েছে।
ছাত্রদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে ড. আজহারী বলেন, “প্রিয় ছাত্র ভাইয়েরা, সময় ও সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাও। নিজেকে গড়ে তোলো। বর্তমান সময়ে দেশে দাওয়াতের ময়দান অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।” একজন শিক্ষার্থীর সফলতার জন্য তিনি তিনটি মৌলিক গুণের কথা উল্লেখ করেন—বিনয়, সফর ও সবর। তাঁর মতে, বিনয় মানুষকে উচ্চতায় পৌঁছায়, সফর চিন্তার পরিধি প্রসারিত করে এবং সবর লক্ষ্য অর্জনে অটল থাকার শক্তি জোগায়।
আলোচনার শেষাংশে তিনি উপস্থিত সকলের কাছে দোয়া কামনা করেন এবং আল্লাহর কাছে এই দাওয়াতি পথচলাকে কবুল করার আবেদন জানান। অনুষ্ঠানটি শেষ হয় সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ, পারস্পরিক আলাপ ও আন্তরিক প্রার্থনার মধ্য দিয়ে। পুরো আয়োজনজুড়ে ছাত্রদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে প্রেরণা, গর্ব ও ভবিষ্যতের দায়িত্ববোধের দীপ্ত প্রত্যয়।
মন্তব্য করুন