হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
২৬ জুলাই ২০২৬, ৬:৩৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামী দাওয়াতের গুরুত্ব

নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা’দ।

প্রিয় পাঠকবৃন্দ, আজ আমি হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী আপনাদের সামনে কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামী দাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরছি। “ওয়া মা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ।”

ইসলামী দাওয়াত মানবজাতির হেদায়াত ও কল্যাণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মহান আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুলকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন মানুষের কাছে তাঁর পরিচয় তুলে ধরার জন্য এবং তাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের পথে আহ্বান করার জন্য। নবী-রাসুলদের প্রধান দায়িত্ব ছিল সৎকাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখা। তারা সবাই তাদের উম্মতকে তাওহিদ ও ইবাদতের শিক্ষা দিয়েছেন এবং শিরক ও পাপাচার থেকে সতর্ক করেছেন।

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

“যারা অনুসরণ করে সেই বার্তাবাহক উম্মী নবীকে, যার উল্লেখ তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইনজিলে লিপিবদ্ধ পায়। তিনি তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন।”
(সূরা আল-আ’রাফ: ১৫৭)

ইসলামী দাওয়াত দেওয়া, অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা প্রত্যেক মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। উম্মতে মুহাম্মদীর অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।”
(সূরা আলে ইমরান: ১০৪)

দাওয়াতের দায়িত্ব প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ নিজ অবস্থান ও দায়িত্বের আলোকে পালন করা উচিত। পরিবারের কর্তার দায়িত্ব স্ত্রী-সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা দেওয়া। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের দায়িত্ব শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা। একইভাবে সমাজের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসক, প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও তাদের অধীনস্থদের সৎকাজে উৎসাহিত করা এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা উচিত।

আরো পড়ুন...  পীরগঞ্জে লাঙ্গল প্রতীকের পক্ষে টাকা বিতরণ: দুই জাপা নেতা জরিমানা

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—

“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
(সহিহ বুখারি)

দাওয়াতের কাজ কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামা, ইমাম-খতিব, মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ইসলামী সংগঠনের কর্মী, লেখক, বক্তা—যে যার অবস্থান থেকে ইসলামের সুমহান বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাই একজনের কাজকে ছোট করে দেখা বা অন্যের দাওয়াতি প্রচেষ্টাকে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।

মানুষকে ইসলামের পথে আহ্বান করতে হবে নম্রতা, প্রজ্ঞা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—

“তোমরা মানুষের সঙ্গে নম্র ব্যবহার করো, কঠোরতা অবলম্বন করো না। সুসংবাদ দাও, মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করো না।”
(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। তাই ইসলামের দাওয়াত কেবল মসজিদ, মাদরাসা, ওয়াজ মাহফিল বা খানকায় সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমেও ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে তাদের বিশ্বাস প্রচার করছে। মুসলমানদেরও উচিত ইতিবাচক, সত্যনিষ্ঠ ও জ্ঞানভিত্তিক উপায়ে ইসলামের সৌন্দর্য বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা।

আরো পড়ুন...  রাবিতে বৈশাখী উৎসব শেষে উদ্বৃত্ত টাকা ফেরত, ভিপির সততার নজির

একই সঙ্গে দাওয়াতের কাজ মুসলিম ও অমুসলিম—উভয়ের কাছেই পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, সুন্দর আচরণ, উত্তম চরিত্র এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াতের মাধ্যমে বহু মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসেছে।

দাওয়াতের পথে অবহেলা, সমালোচনা বা কষ্টের সম্মুখীন হলেও হতাশ হওয়া যাবে না। কারণ, নবী-রাসুলরাও দাওয়াত দিতে গিয়ে নানা বাধা ও কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—

“একজন বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সাহায্যে থাকেন।”
(সহিহ মুসলিম)

অন্যের ঈমান ও আমল সংশোধনের কাজে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করলে আল্লাহ তাআলা নিজের ঈমান ও আমলও সুন্দর করে দেন।

পরিশেষে, ইসলামী দাওয়াত কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব নয়; বরং এটি প্রত্যেক সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সুন্দর চরিত্র, উত্তম আচরণ, প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে ইসলামের সঠিক শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সকলের কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে দাওয়াতি কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক:
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।
সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা, উপশহর, সিলেট।
সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদরাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মোরেলগঞ্জে নগদ টাকা স্বর্ণালংকার নিয়ে নববধূ উধাও

১

মোরেলগঞ্জে শিক্ষকদের জিপিএফ ফান্ড জালিয়াতি: ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, তদন্তে দুদক

২

মোরেলগঞ্জে ব্রি ধান-১০৩ চাষে উৎসাহিত করতে কৃষকদের মাঝে সার ও বীজ বিতরণ

৩

ফুটবলের সঙ্গে স্বপ্নের পাঠশালা, যশোরে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্ম

৪

বঞ্চনা আর দুর্গমতার আড়ালে হারিয়ে গেছে পাহাড়ের নিরাপদ স্যানিটেশন

৫

সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে বিকল ফিশিং বোট, ১৩ জেলে উদ্ধার

৬

ব্যক্তি নয়, তথ্যই মুখ্য: সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথচলায় প্রফেসর ড. আবু নাছের

৭

শ্রীপুর প্রেস ক্লাবের ভবনের ছাদ ঢালাই কাজের উদ্বোধন

৮

মোরেলগঞ্জে সিসিআরসি নির্বাহী কমিটির নির্বাচন সম্পন্ন

৯

মোরেলগঞ্জে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত

১০

কুলিয়ারচরে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী শহীদ উদ্দিন বাবুলের গণসংযোগ

১১

বেতিল হাট-বাজার বণিক সমবায় সমিতির নির্বাচনে ভোটার সিরিয়াল কার্ড বিতরণ

১২

মিরুখালী স্কুল অ্যান্ড কলেজে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ‘মেলবন্ধন’

১৩

কুষ্টিয়ায় শ্রমিক নেতা কমরেড রেজন বিশ্বাসের স্মরণসভা অনুষ্ঠিত

১৪

শান্তিপূর্ণ বদরগঞ্জ অশান্তের চেষ্টা হলে জবাব দেওয়া হবে: তাতী দল সভাপতি

১৫

মহিপুরে দুই একাডেমিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন

১৬

যাঁকে ভালোবাসা ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না

১৭

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান

১৮

বিদেশে পাঠানোর কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ, যশোরে ভুক্তভোগীদের সংবাদ সম্মেলন

১৯

দেশ ও স্বাস্থ্যখাতে অস্থিরতার প্রতিবাদে কুড়িগ্রামে ড্যাবের মানববন্ধন

২০