
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবন জড়িয়ে আছে নদী, খাল, বিল ও জলাধারের সঙ্গে। একসময় গ্রামের খাল ছিল নৌপথ, কৃষকের সেচব্যবস্থা, জেলের জীবিকা এবং বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দখল ও ভরাটের কারণে দেশের অসংখ্য খাল আজ মৃতপ্রায়। ফলে একদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, অন্যদিকে বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও বন্যার মতো দুর্ভোগে পড়ছে মানুষ।
এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের বৃহৎ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে একযোগে ৫৪ জেলায় এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। কৃষি, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ রক্ষা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া এই উদ্যোগ দেশজুড়ে আশার সঞ্চার করেছে।
তবে এত বড় কর্মসূচির প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের ওপর। অতীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ দেখা গেছে। কোথাও কাগজে-কলমে খাল খনন দেখানো হলেও বাস্তবে সুফল পায়নি সাধারণ মানুষ। আবার কোথাও নির্ধারিত গভীরতা বা দৈর্ঘ্য বজায় রাখা হয়নি, ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই খাল পুনরায় ভরাট হয়ে গেছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে খাল কাটার প্রতিটি প্রকল্পের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা জরুরি। কোন খাল কোথা থেকে কোথায় পর্যন্ত খনন হবে, কত কিলোমিটার দৈর্ঘ্য, কত ফুট প্রশস্ত ও কত গভীর হবে, কত টাকা বরাদ্দ রয়েছে, কোন ঠিকাদার কাজ করছে এবং কাজের মেয়াদ কতদিন—এসব তথ্য জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
প্রতিটি প্রকল্প এলাকায় বড় তথ্যসম্বলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করা হলে সাধারণ মানুষ সহজেই কাজের অগ্রগতি ও ব্যয়ের তথ্য জানতে পারবেন। এতে সামাজিক নজরদারি বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমবে। একজন কৃষক বা স্থানীয় বাসিন্দাও বুঝতে পারবেন প্রকল্প অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না।
খাল খননের পদ্ধতি নিয়েও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। কোথাও শ্রমিক দিয়ে কাজ করা হলে তা গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি অনেক পরিবারের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। আবার বড় খাল বা গভীর জলাধারের ক্ষেত্রে ভেকু বা ড্রেজার ব্যবহার সময় ও শ্রম সাশ্রয় করতে পারে। তাই কোথায় কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যাও জনগণের সামনে থাকা দরকার।
একই সঙ্গে প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও যেন তথ্য সংরক্ষিত থাকে, সেজন্য প্রতিটি খালের পাশে স্থায়ী ফলক স্থাপন করা যেতে পারে। সেখানে খালের নাম, খননের সাল, ব্যয়, দৈর্ঘ্য, গভীরতা এবং বাস্তবায়নকারী দপ্তরের তথ্য উল্লেখ থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানতে পারবে কীভাবে খালটি পুনর্জীবিত হয়েছিল।
একটি উন্নয়ন প্রকল্প তখনই সফল হয়, যখন জনগণ সেটিকে নিজেদের সম্পদ মনে করে। জনগণকে তথ্য থেকে দূরে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরং জনগণের অংশগ্রহণ, সামাজিক নজরদারি ও উন্মুক্ত তথ্যই উন্নয়নকে কার্যকর ও জনমুখী করে তোলে।
বাংলাদেশের খাল, নদী ও জলাধার শুধু পানির উৎস নয়; এগুলো এই দেশের প্রাণ, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের অংশ। তাই খাল কাটার এই মহাপরিকল্পনা যেন কেবল কাগুজে উন্নয়ন হয়ে না থাকে। এটি যেন কৃষকের জমিতে পানি পৌঁছে দেয়, জলাবদ্ধতা কমায়, জেলেদের জীবিকা ফিরিয়ে দেয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করে—সেটিই এখন দেশের মানুষের প্রত্যাশা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর কাছে বিনীত আহ্বান—এই বিশাল কর্মসূচিকে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তুলুন। জনগণের টাকায় জনগণের কাজ—তাই সব তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকুক। তাহলেই উন্নয়ন হবে দৃশ্যমান, টেকসই এবং সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণমুখী।
মন্তব্য করুন