মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
১১ মে ২০২৬, ২:০১ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

কচি মুখের আহার কেড়ে নেওয়া: আমাদের মানবতার নির্মম পরীক্ষা

একটি শিশু যখন ক্ষুধার্ত থাকে, তখন শুধু তার পেটই খালি থাকে না—খালি হয়ে যায় তার মনোযোগ, স্বপ্ন, আনন্দ আর শেখার শক্তিও। ক্ষুধার কষ্ট একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও সহজে সহ্য করতে পারে না, সেখানে কোমলমতি শিশুর জন্য এটি কতটা নির্মম বাস্তবতা, তা বোঝা যায় গ্রামের কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যাহ্ন বিরতির দৃশ্য কাছ থেকে দেখলে।

সকালে অনেক শিশু সামান্য ভাত, কখনো শুকনো রুটি, আবার কখনো কিছু না খেয়েই বিদ্যালয়ে আসে। ক্লাসের পর ক্লাস চলতে থাকে। ধীরে ধীরে ক্ষুধা তাদের চোখ-মুখে ক্লান্তির ছাপ ফেলে। পাঠে মনোযোগ কমে যায়, মুখের হাসি মলিন হয়ে পড়ে। ঠিক তখনই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া সামান্য একটি ডিম, একটি কলা, একটি রুটি কিংবা কিছু পুষ্টিকর খাবার তাদের কাছে হয়ে ওঠে আশীর্বাদস্বরূপ। এই ক্ষুদ্র আয়োজনই শিশুর মনে নতুন শক্তি জোগায়, ক্লাসে ফিরিয়ে আনে প্রাণচাঞ্চল্য।

একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো শিশুদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা। সেই ভাবনা থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে “মিড-ডে মিল” বা মধ্যাহ্নকালীন পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি চালু হয়েছে। এটি কেবল খাবার বিতরণের প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ, সচেতন ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলার একটি মানবিক উদ্যোগ। কারণ, একটি শিশু আজ বিদ্যালয়ে যত যত্ন পাবে, আগামী দিনে সেই শিশুই দেশ গঠনের দায়িত্ব কাঁধে নেবে।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এই শিশুদের খাবার নিয়েও নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবহেলার সংবাদ প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। কোথাও খাবারের মান নিম্নমানের, কোথাও পচা ডিম, বাসি রুটি বা নষ্ট কলা বিতরণের অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার কোথাও শিশুদের প্রাপ্য খাদ্য কমিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক ঘটনাও ঘটে। এসব সংবাদ শুধু হতাশই করে না, বিবেকবান মানুষকে লজ্জিতও করে।

আরো পড়ুন...  ক্ষমতার বন্দুকের নীচে বাংলাদেশ

একটি শিশুর জন্য বরাদ্দকৃত সামান্য খাবারে ভাগ বসানো কোনো সাধারণ অনিয়ম নয়; এটি মানবিকতার বিরুদ্ধে এক নীরব অপরাধ। কারণ, যে খাবারটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন, সেটি কেড়ে নেওয়া মানে তার বেড়ে ওঠার পথকে বাধাগ্রস্ত করা। যে শিশু আনন্দভরে একটি ডিম হাতে নিয়ে হাসে, সেই শিশুর মুখে যদি পচা খাবারের দুর্গন্ধ এসে লাগে, তাহলে তার সেই নিষ্পাপ আনন্দ মুহূর্তেই মলিন হয়ে যায়।

একজন মা-বাবা নিজেরা না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন। সন্তানের হাসিতেই তারা তৃপ্তি খুঁজে পান। একজন শিক্ষকও অনেকটা মা-বাবার মতোই জাতি গড়ার কারিগর। তাই একজন শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি শিশুদের প্রাপ্য খাদ্যে অনিয়ম করেন, তবে সেটি শুধু দায়িত্বের ব্যর্থতা নয়, নৈতিকতারও চরম অবক্ষয়।

বিশেষ করে শহর ও গ্রামের শিশুদের বাস্তবতায় বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। শহরের অনেক শিশু যেখানে পরিবারের বাড়তি যত্ন ও পুষ্টিকর খাবার পায়, সেখানে অজপাড়া গাঁয়ের অনেক শিশু বিদ্যালয়ের এই সামান্য খাবারের দিকেই তাকিয়ে থাকে। মধ্যাহ্ন বিরতিতে একটি ডিম, একটি কলা কিংবা একটি রুটি তাদের কাছে কেবল খাবার নয়; এটি আনন্দ, স্বস্তি ও ভালোবাসার প্রতীক। সেই আনন্দ কেড়ে নেওয়া মানে তাদের শৈশবের এক টুকরো আলো নিভিয়ে দেওয়া।

আরো পড়ুন...  ফেসবুককে বিচারক বানিয়ে ফেলছি না তো?

প্রকৃতিতেও দেখা যায়, অনেক হিংস্র প্রাণী পর্যন্ত নিজের শাবককে আগলে রাখে, তার খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অথচ মানুষ হিসেবে আমরা যদি একটি মানব শিশুর মুখের আহার কেড়ে নিই, তবে আমাদের মানবতা কোথায় দাঁড়ায়? কোথায় আমাদের মমতা, শিশুপ্রীতি ও নৈতিক বোধ?

তবে এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। খাদ্য সরবরাহে কঠোর তদারকি থাকতে হবে। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমন্বিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। যারা নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করবে কিংবা শিশুদের প্রাপ্য খাদ্যে দুর্নীতি করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি মানুষকে বুঝতে হবে—শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা মানে দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো শিশু ক্ষুধার কারণে ক্লাসে মনোযোগ হারাবে না; যেখানে বিদ্যালয়ের মধ্যাহ্নভোজ হবে আনন্দের উৎস; যেখানে একটি শিশুর হাতে তুলে দেওয়া ডিম, রুটি বা কলা হবে নির্মল ভালোবাসার প্রতীক। কারণ, শিশুর হাসি বাঁচলে বাঁচবে আগামী দিনের বাংলাদেশ।

আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক। শিশুরা বাঁচুক, সুস্থ থাকুক, স্বপ্ন দেখুক। তারাই তো আগামী দিনের কর্ণধার।

লেখক ~ কলামিস্ট

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বরিশালে নারীর সঙ্গে সময় কাটাতে আবাসিক হোটেলে যুবক, মৃত্যু ঘিরে রহস্য

মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের ‘দালাল’ আখ্যা বন্ধের দাবি—খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন

মঠবাড়িয়ায় ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে অপমানের প্রতিবাদে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের মানববন্ধন

কচি মুখের আহার কেড়ে নেওয়া: আমাদের মানবতার নির্মম পরীক্ষা

আইনের প্রতি বৃদ্ধা আঙুল দেখিয়ে সাংবাদিক পরিবারকে বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকা ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন বিশ্বনাথ উপজেলা

রণক্ষেত্র গোপালগঞ্জ, নারীসহ আহত ১২

সুন্দরবনে বাঘের হামলায় গুরুতর আহত মৌয়াল

মোংলায় সম্পত্তির লোভে জন্মদাতা বাবাকেই বাড়িছাড়া করলেন মেয়ে

রাজশাহীতে ১১ দিনেও উদ্ধার হয়নি নিখোঁজ স্কুলছাত্রী, পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ

১০

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে চট্টগ্রাম জেলা চ্যাম্পিয়ন পটিয়া বালিকা দলকে সংবর্ধনা

১১

সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসককে প্রধান করে ৭ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন

১২

নলডাঙ্গায় জালনোট প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

১৩

হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা: ৬৫ বাণিজ্যিক জাহাজকে রুট পরিবর্তনে বাধ্য করার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

১৪

কালিয়াকৈরে গরুচোর সন্দেহে গণপিটুনিতে ৩ জনের মৃত্যু

১৫

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভুয়া ওয়ারিশ সনদে নামজারির চেষ্টা, এক ব্যক্তির কারাদণ্ড

১৬

শাহজাদপুরে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উৎসবের তিন দিনের আয়োজনের সমাপ্তি

১৭

আলীকদমে ৫৭ বিজিবির উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ

১৮

দারিদ্র্যকে হারিয়ে ফুটবলে উজ্জ্বল নাদিরা, ভাণ্ডারিয়ার নতুন ক্রীড়া বিস্ময়

১৯

রাজশাহীতে তাস ও নগদ টাকাসহ ৬ জুয়াড়ি গ্রেপ্তার

২০