পঞ্চগড়ে মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র মায়েদের জন্য প্রদত্ত মাতৃত্বকালীন ভাতা বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে জেলার চাকলাহাট ইউনিয়নে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে অযোগ্য ব্যক্তিদের ভাতাভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এছাড়া ভাতার সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত চাকলাহাট ইউনিয়নে মোট ৪৯৩ জন নারীকে মাতৃত্বকালীন ভাতাভোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে তালিকায় একটি অস্বাভাবিক বিষয় নজরে এসেছে। ভাতাভোগীদের ঠিকানায় গ্রামের নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে “নতুন গ্রাম”। অথচ চাকলাহাট ইউনিয়নের ৫৬টি গ্রামের মধ্যে “নতুন গ্রাম” নামে কোনো গ্রামের অস্তিত্ব নেই।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার জন্য আবেদনকারীকে প্রথম বা দ্বিতীয় গর্ভধারণকালীন অবস্থায় থাকতে হবে, বয়স ২০ বছরের বেশি হতে হবে এবং গর্ভবতী অবস্থায় আবেদন করতে হবে। এছাড়া নির্ধারিত অন্যান্য শর্তের মধ্যে অন্তত দুটি শর্ত পূরণ করতে হয়। একজন নারী জীবনে মাত্র একবার ২৪ মাসের জন্য এই সুবিধা ভোগ করতে পারেন।
কিন্তু সরেজমিনে চাকলাহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত অনেকেই এসব শর্ত পূরণ করেন না। অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় এমন নারীদের নাম রয়েছে যাদের তিন বা ততোধিক সন্তান রয়েছে। কারও সন্তান ইতোমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে। আবার অনেকের বয়স ও গর্ভধারণের সময়কালও সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে জনপ্রতিনিধিদের প্রভাব খাটিয়ে এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রকৃত দরিদ্র ও যোগ্য গর্ভবতী নারীরা বঞ্চিত হয়েছেন।
এ বিষয়ে চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, “চাকলাহাট ইউনিয়নে ‘নতুন গ্রাম’ নামে কোনো গ্রাম নেই। এখানে মোট ৫৬টি গ্রাম রয়েছে। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো টাকা নিইনি। ভাতাভোগীর তালিকা ইউপি সদস্যরা প্রস্তুত করেন। আমার আমলে কোনো ইউপি সদস্যের মেয়ে মাতৃত্বকালীন ভাতা পাননি। তবে কেউ যদি তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে ভাতা পেয়ে থাকে, তাহলে সেখানে অবশ্যই অনিয়ম হয়েছে।”
পঞ্চগড় জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ আনিছুর রহমান মঙ্গলবার (২৩ জুন) বলেন, “‘নতুন গ্রাম’ উল্লেখ হওয়ার বিষয়টি সফটওয়্যারের ত্রুটিজনিত কারণে হয়েছে। এছাড়া অনিয়মের যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাতৃত্বকালীন ভাতা কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রকৃত উপকারভোগীদের বঞ্চিত করে অযোগ্য ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি বিতর্কিত তালিকা পুনরায় যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত দরিদ্র ও যোগ্য নারীদের ভাতার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মন্তব্য করুন