বাংলাদেশে দাঁতের অপচিকিৎসা ও ভুয়া দন্ত চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য নীরবে এক গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, সঠিক তদারকির অভাব এবং ভুয়া চিকিৎসকদের বিস্তারের কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
দাঁতের সমস্যা অনেকেই তুচ্ছ ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু ভুল চিকিৎসা বা অপচিকিৎসার কারণে ছোট সমস্যা বড় জটিলতায় রূপ নিতে পারে। ভুলভাবে করা রুট ক্যানেল, ফিলিং বা দাঁত তোলার ফলে দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, মাড়ির সংক্রমণ, এমনকি দাঁত নড়ে যাওয়া বা পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণ এক দাঁত থেকে অন্য দাঁতে ছড়িয়ে পড়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তোলে।
চিকিৎসা ব্যবস্থার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতির অভাব। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক ডেন্টাল চেম্বারে যথাযথ sterilization প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না। ফলে রোগীদের মধ্যে মাড়ির ফোড়া (Abscess), ইনফেকশন এমনকি হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি বা এইডসের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সংক্রমণ রক্তের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকটের অন্যতম কারণ ভুয়া দন্ত চিকিৎসকদের বিস্তার। দেশে অনেকেই প্রয়োজনীয় ডিগ্রি বা নিবন্ধন ছাড়াই “ডেন্টিস্ট” পরিচয়ে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। কারিগরি জ্ঞান বা ভুয়া সনদের ভিত্তিতে চেম্বার খুলে বসা এসব ব্যক্তির কাছে চিকিৎসা নিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
এছাড়া ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের ভূমিকা নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাদের মূল কাজ চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেকেই চিকিৎসক সেজে রোগী দেখছেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ ও অনৈতিক।
অপচিকিৎসার প্রভাব শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও আর্থিক ক্ষেত্রেও পড়ছে। দীর্ঘদিনের ব্যথা, চিকিৎসার ব্যর্থতা এবং পুনরায় চিকিৎসার প্রয়োজন রোগীদের মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। পাশাপাশি একই সমস্যার জন্য বারবার খরচ বহন করতে গিয়ে আর্থিক চাপও বাড়ছে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতি এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। অনেক ভুয়া চিকিৎসক দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালালেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হয়। কখনো অভিযান চালিয়ে শাস্তি দেওয়া হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না।
তবে এই সংকট মোকাবিলায় সচেতনতার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দাঁতের চিকিৎসা নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের ডিগ্রি ও নিবন্ধন নম্বর যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা এবং অবৈধ চেম্বারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের জীবাণুমুক্তকরণ নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত না হলে এ সংকট আরও গভীর হবে। তাই সচেতনতা, তদারকি এবং আইন প্রয়োগ—এই তিনটি বিষয়েই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যাতে মানুষের হাসি আবার হয়ে ওঠে নিরাপদ ও স্বস্তির প্রতীক।
মন্তব্য করুন