আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো অ্যানেস্থেসিয়া (Anesthesia)। এই প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমানে জটিল থেকে জটিলতর অস্ত্রোপচারও রোগীকে অসহনীয় ব্যথা ছাড়াই নিরাপদে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। এক সময় অস্ত্রোপচারের কথা শুনলেই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ত, কারণ তখন কার্যকর ব্যথানাশক ব্যবস্থা ছিল না। আজ অ্যানেস্থেসিয়ার অগ্রগতির ফলে রোগীর নিরাপত্তা, স্বস্তি এবং সফল অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অ্যানেস্থেসিয়া হলো এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে বিশেষ ধরনের ওষুধ (অ্যানেস্থেটিক) ব্যবহার করে শরীরের নির্দিষ্ট অংশ অথবা পুরো শরীরকে সাময়িকভাবে অনুভূতিহীন বা চেতনাহীন করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অস্ত্রোপচার, বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি বা বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় রোগীকে সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত রাখা এবং চিকিৎসককে নিরাপদে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া।
আমাদের শরীরে ব্যথার অনুভূতি স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে। অ্যানেস্থেটিক ওষুধ সাময়িকভাবে এই স্নায়ু সংকেতের আদান-প্রদান বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত করে। ফলে ব্যথার অনুভূতি মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে না।
জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়ার ক্ষেত্রে ওষুধ সরাসরি মস্তিষ্কের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে রোগীকে গভীর নিদ্রাসদৃশ অবস্থায় নিয়ে যায়। এ সময় রোগী কোনো ব্যথা অনুভব করেন না এবং অস্ত্রোপচারের স্মৃতিও সাধারণত মনে থাকে না।
এটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্য ব্যবহৃত হয়। রোগী সম্পূর্ণ অজ্ঞান থাকেন এবং কোনো ব্যথা অনুভব করেন না। প্রয়োজনে শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখতে ভেন্টিলেটর বা অন্যান্য শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়ক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।
এ ক্ষেত্রে শরীরের একটি বড় অংশ সাময়িকভাবে অবশ করা হয়। যেমন—কোমর থেকে নিচের অংশ অবশ করে সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। স্পাইনাল ও এপিডুরাল অ্যানেস্থেসিয়া এই পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত।
শরীরের ছোট একটি নির্দিষ্ট অংশ অবশ করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। দাঁতের চিকিৎসা, ছোট টিউমার অপসারণ বা ত্বকের ছোট অস্ত্রোপচারে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
কিছু ক্ষেত্রে রোগীকে পুরোপুরি অজ্ঞান না করে ওষুধের মাধ্যমে শান্ত রাখা হয়। একই সঙ্গে রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, অক্সিজেনের মাত্রা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। চোখের অপারেশনসহ কিছু বিশেষ অস্ত্রোপচারে এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
অ্যানেস্থেসিয়া কোনো সাধারণ ইনজেকশন নয়; এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিশেষায়িত চিকিৎসা পদ্ধতি। তাই এটি শুধুমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অর্থাৎ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট প্রদান করতে পারেন।
অ্যানেস্থেসিওলজিস্টরা এমবিবিএস ডিগ্রির পর অ্যানেস্থেসিয়া বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও বিশেষায়িত ডিগ্রি (যেমন MD, FCPS বা ডিপ্লোমা) অর্জন করেন। তাঁদের সহায়তায় অ্যানেস্থেসিয়া টেকনিশিয়ান বা প্রশিক্ষিত নার্স কাজ করলেও তাঁরা এককভাবে অ্যানেস্থেসিয়া দিতে পারেন না।
অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার আগে রোগীর বয়স, ওজন, অ্যালার্জি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফুসফুসের সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ওষুধের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
অপারেশনের পুরো সময় রোগীর রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন, অক্সিজেনের মাত্রা ও শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। কোনো জটিলতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা কেবল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অ্যানেস্থেসিওলজিস্টেরই থাকে। অপারেশন শেষে রোগীকে নিরাপদে জ্ঞান ফিরিয়ে আনা এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করাও তাঁদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বর্তমানে অ্যানেস্থেসিয়া অত্যন্ত নিরাপদ হলেও কিছু সাময়িক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমন—
এসব উপসর্গ সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেরে যায়।
নিরাপদ অ্যানেস্থেসিয়ার জন্য রোগীকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলতে হয়।
সাধারণত অপারেশনের আগে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা খালি পেটে থাকতে বলা হয়। কারণ অ্যানেস্থেসিয়ার সময় শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক রিফ্লেক্স কমে যায়। পেটে খাবার থাকলে তা ফুসফুসে প্রবেশ করে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
রোগীর যদি কোনো ওষুধে অ্যালার্জি, হাঁপানি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা থাকে, তবে তা অবশ্যই অ্যানেস্থেসিওলজিস্টকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত সেবন করা সব ওষুধের তালিকাও জানানো জরুরি। বিশেষ করে রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবন করলে তা আগে থেকেই চিকিৎসককে অবহিত করতে হবে।
অনেকে মনে করেন অ্যানেস্থেসিয়া শুধু একটি ইনজেকশন বা ঘুমের ওষুধ। বাস্তবে এটি অত্যন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক ও জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি। ভুল মাত্রা, অনভিজ্ঞ ব্যক্তি বা অনিরাপদ পরিবেশে অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এমনকি স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি বা মৃত্যুও ঘটতে পারে।
তাই যে কোনো অস্ত্রোপচারের আগে নিশ্চিত হতে হবে যে অ্যানেস্থেসিয়া একজন যোগ্য ও নিবন্ধিত অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের তত্ত্বাবধানে দেওয়া হচ্ছে।
অ্যানেস্থেসিয়া আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অনন্য আশীর্বাদ। সঠিক রোগী মূল্যায়ন, দক্ষ অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের তত্ত্বাবধান, উন্নত যন্ত্রপাতি এবং রোগীর সচেতন সহযোগিতার মাধ্যমে এটি বর্তমানে অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। তাই অযথা ভয় না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করাই নিরাপদ ও সফল অস্ত্রোপচারের অন্যতম পূর্বশর্ত। সচেতনতা, সঠিক তথ্য এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শই নিরাপদ অস্ত্রোপচারের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
মন্তব্য করুন