জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবে বাংলাদেশ এখন অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ‘বজ্রপাত’-এর ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বছর বিশেষ করে মে থেকে জুন মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। এই বাস্তবতায় পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে শুধু ঘোষণা নয়, গণসচেতনতা এবং যথাযথ প্রস্তুতির মাধ্যমেই এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল, খোলা মাঠ এবং কৃষিপ্রধান এলাকায় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। জমিতে কাজ করার সময় কৃষক, নদী-খালে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে এবং খোলা মাঠে খেলতে থাকা শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং বড় গাছপালা, বিশেষ করে তাল ও সুপারি গাছ নির্বিচারে কেটে ফেলার ফলে বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে সৃষ্ট অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চার্জ বজ্রপাতের মাধ্যমে মাটিতে নেমে আসে। গ্রামীণ এলাকায় পর্যাপ্ত উঁচু গাছ না থাকায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকতে কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। কালো মেঘ দেখা দিলে বা বজ্রপাত শুরু হলে দ্রুত কোনো পাকা ভবনে আশ্রয় নিতে হবে। টিন বা খড়ের ঘর তুলনামূলকভাবে নিরাপদ নয়। খোলা মাঠ, উঁচু গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা মোবাইল টাওয়ারের নিচে অবস্থান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
যদি গাড়ির ভেতরে থাকেন, তবে জানালা বন্ধ রেখে গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করাই নিরাপদ। কারণ গাড়ির ধাতব কাঠামো বজ্রপাতের বিদ্যুৎ বাইরে দিয়ে মাটিতে প্রবাহিত হতে সাহায্য করে। ঘরের ভেতরে থাকলে বজ্রপাতের সময় প্লাগে সংযুক্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করাই ভালো। একই সঙ্গে ল্যান্ডফোন ব্যবহার থেকেও বিরত থাকতে হবে।
বজ্রপাতের সময় নদী, পুকুর বা যেকোনো জলাশয়ে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই দ্রুত পানি থেকে উঠে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গ্রামীণ ও হাওরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে তালগাছসহ অন্যান্য উঁচু গাছ রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে। এসব গাছ প্রাকৃতিকভাবে বজ্রপাতের আঘাত শোষণ করে ঝুঁকি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি কৃষক ও মাঠে কর্মরত মানুষের নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস দ্রুত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বজ্রপাত একটি স্বল্পস্থায়ী হলেও অত্যন্ত প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ। একে প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও সচেতনতা, সতর্কতা এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—নিজে সচেতন হব, অন্যকেও সচেতন করব এবং নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে সক্রিয় ভূমিকা রাখব।
মন্তব্য করুন