হুমায়ুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম
২৪ জুলাই ২০২৬, ৮:১৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

কোনো মা-বাবাকে যেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়’ — কুড়িগ্রামের জুলাই শহীদ রাজিবের মা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া কুড়িগ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থী ও স্কাউট সদস্য রাজিব উল করিম সরকার (রাব্বী)-এর স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তার পরিবারকে। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন মা জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি বলেন, “কোনো মা-বাবাকে যেন আর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। দেশে এমন পরিবেশ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, যাতে আর কোনো পরিবারকে সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে না হয়।”

তিনি আরও বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের গালিচার ওপর দাঁড়িয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা যেন কখনো সেই রক্তের সঙ্গে বেঈমানি না করে। আল্লাহ যেন এমন দিন না দেখান। যারা বেঈমানি করবে, তাদের পরিণতিও ইতিহাসে যেমন হয়েছে, তেমনই হবে।”

আন্দোলনে গিয়ে আর ফেরা হয়নি

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের জয়কুমার গ্রামের বাসিন্দা রাজিব উল করিম সরকার রাব্বী বাবা-মায়ের চাকরির সুবাদে লালমনিরহাটে বেড়ে ওঠেন। তিনি লালমনিরহাট সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট তিনি ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন। পরদিন ৫ আগস্ট লালমনিরহাটের মিশন মোড়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ হন। পরে গভীর রাতে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন খানের বাসা থেকে আগুনে পোড়া অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

‘জায়নামাজে বসেই ছেলের মৃত্যুর খবর পাই’

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রাজিবের মা বলেন, ৫ আগস্ট রাত ১১টার পর থেকে ছেলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।

আরো পড়ুন...  কালিয়াকৈরে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে ৫ শতাধিক রোগীকে সেবা

তিনি বলেন, “আমার ছোট ছেলে আমাকে বলেছিল, বিপদে পড়লে একটি দোয়া পড়তে। আমি সঙ্গে সঙ্গে জায়নামাজে বসে দোয়া পড়তে শুরু করি। একই সময় ফেসবুকে পোস্ট দিই—‘রাজিবকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কেউ পেলে জানাবেন।’ রাত দেড়টার দিকে আমার ছোট দেবর ফোন করে কান্না শুরু করলে আমি বুঝতে পারি, আমার ছেলেটা আর নেই। আমি জায়নামাজে বসেই ছেলের মৃত্যুর খবর পাই।”

তিনি আরও বলেন, “আমার ছেলের চুল বা দাড়ি পুড়ে যায়নি। শুধু ধোঁয়া আর আগুনে তার শরীর কালো হয়ে গিয়েছিল। সেই দৃশ্য আজও ভুলতে পারি না।”

‘ছেলেকে মানুষ করেছে তার বাবা’

রাজিবের শৈশব স্মরণ করে জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, চাকরির কারণে দীর্ঘদিন তিনি ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে আলাদা থাকতেন। বড় ছেলে রাজিব বাবার কাছেই বড় হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমি ছেলের যত্ন করতে পারিনি। ওর বাবাই তাকে মানুষ করেছে। রান্না থেকে শুরু করে সব কাজ নিজেই করত। লেখাপড়া, স্কাউটিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই সে ছিল অসাধারণ। প্রেসিডেন্ট স্কাউট অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিল।”

স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হওয়ার

রাজিবের মা জানান, ছেলের স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। রক্ত দেখলে ভয় পেত বলে চিকিৎসক হতে চাইত না।

তিনি বলেন, “ও বলেছিল, একদিন নিজের হাতে আমাদের বাড়ির সুন্দর একটি নকশা করবে। ওর অনেক বন্ধু বুয়েটে সুযোগ পেয়েছে। আমার বিশ্বাস, রাজিবও পারত।”

‘ছেলে নয়, আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু ছিল’

রাজিবের বাবা রেজাউল করিম সরকার, যিনি লালমনিরহাটের বেগম কামরুন্নেছা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক, আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন,

আরো পড়ুন...  রামপালে পোল্ট্রি ব্যবসায়ী আনোয়ার বিপাকে

“আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অথচ স্বাধীন দেশে আবার স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করতে হলো। রাজিব শুধু আমার ছেলে ছিল না, সে ছিল আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু। তাকে আমি নিজ হাতে বড় করেছি। আজও তাকে ভুলতে পারিনি।”

তিনি বলেন, “ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

ভাইদের স্মৃতিতে রাজিব

ছোট ভাই মেজবাহ উল করিম সরকার বলেন, “ভাইয়ার সঙ্গে মাছ ধরতাম, পাখি পালন করতাম। বাইরে কাঁদতে পারি না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন কাঁদি।”

মেঝো ভাই জামিউল করিম সরকার বলেন, “৪ আগস্ট ভাইয়া বলেছিল আন্দোলনে যাবে। আমাদের যেতে দেয়নি। পরে ফেসবুক লাইভে দেখি, সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ভাইয়া ধরা পড়েছে। তখন বুঝতে পারি, সে আন্দোলনে ছিল।”

জুলাই যোদ্ধাদের মর্যাদা নিশ্চিতের দাবি

রাজারহাট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক আল মিজান বলেন, জুলাই আন্দোলনে কুড়িগ্রামে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১৩৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাজারহাট উপজেলায় আহত হন ১১৪ জন এবং শহীদ হন একজন—রাজিব।

তিনি বলেন, *“প্রকৃত জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে কেউ যেন ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।”

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘মেয়েটি নিজেই গাজী নজরুলের সেবা করতে চেয়েছিল’—জামায়াত এমপি

লবণাক্ত উপকূলীয় রামপালে সুপেয় পানি সংরক্ষণে পানির ট্যাংক বিতরণ

কর্জশোধ, রিজিক বৃদ্ধি ও বৈষয়িক উন্নতি

কিশোরগঞ্জে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় স্কুলছাত্র ও মাইক্রোবাসচালক নিহত, আহত ৬

মজুরি সংকটে বিপাকে কৃষক, মাগুরায় আনসার-ভিডিপির স্বেচ্ছাশ্রমে কাটা হলো পাট

নড়াইলে ইউপি সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন

কোনো মা-বাবাকে যেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়’ — কুড়িগ্রামের জুলাই শহীদ রাজিবের মা

ফকিরহাটে প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ ও ৬০০ চারা বিতরণ

নলডাঙ্গায় নবাগত এসিল্যান্ডের সঙ্গে উপজেলা প্রেসক্লাবের মতবিনিময় সভা

শ্যামনগরে মাদার নদীর ওপর বাঁশের সাঁকোর স্থানে সেতু নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন

১০

গণভোটের রায় ও জুলাই আন্দোলন নিয়ে গড়িমসি করলে সরকারকে জনগণের জবাব দিতে হবে: এটিএম আজহার ইসলাম

১১

সিলেট বিভাগীয় সমাবেশ সফল করতে বিশ্বনাথে জামায়াতের লিফলেট বিতরণ

১২

৩ টাকার টিকিটে ৫ টাকা আদায়ের অভিযোগ, পূর্বধলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনিয়মের অভিযোগে ক্ষোভ

১৩

খাল খনন প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিল মোরেলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন

১৪

মাগুরায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সঙ্গে জামায়াতের মতবিনিময় সভা ও দোয়া মাহফিল

১৫

নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব সম্পর্কে জানুন

১৬

সৈয়দ দিদারুল হক মাইজভাণ্ডারীর ওফাত দিবসে পটিয়ায় বৃক্ষরোপণ ও এতিম শিশুদের খাবার বিতরণ

১৭

চন্দনাইশে পুলিশের অভিযানে ৩ আসামি গ্রেপ্তার

১৮

তিন কেজি গাঁজাসহ ডিবির অভিযানে মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

১৯

ঝালকাঠিতে যৌথ অভিযানে ২২ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ, আগুনে ধ্বংস

২০