রংপুরের বদরগঞ্জে অসম প্রেমের মূল্য দিতে গিয়ে প্রাণহীন হওয়ার জোগাড় হলো ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের। শুধু এক কিশোরীকে ভালোবাসার অপরাধে তাঁর ওপর চালানো হয় নারকীয় নির্যাতন। মেয়ের বাবা নিজ হাতে ছেলেটিকে মিথ্যা চুরির অপবাদ দিয়ে মধ্যযুগীয় পদ্ধতিতে পেটাতে থাকে, সুই ফোটায়, পেরেক ও প্লাস দিয়ে নখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা চালায়। বর্তমানে ওই কিশোর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
গত সোমবার (২০ এপ্রিল) রাতে বদরগঞ্জ উপজেলার কালুপাড়া ইউনিয়নের মাঝিপাড়া গ্রামে ঘটে এই পৈশাচিক ঘটনা। নির্যাতনের শিকার নয়ন চন্দ্র (১৪) ওই গ্রামের লালভেলু চন্দ্রের ছেলে। ধর্মীয় পরিচয়ে নয়ন সনাতনী আর প্রেমিকা মুসলিম সম্প্রদায়ের — এই পার্থক্যই যেন বাঁধন হয়ে দাঁড়ায় তাঁর মৃত্যুর কারণ।
স্থানীয় সূত্র ও লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নয়নের ওই কিশোরীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ঘটনার রাতে প্রেমিকা তাঁকে বাড়ির জানালার পাশে আসতে বলে। সেখানে দাঁড়িয়ে দুজনে গল্প করছিল, ঠিক তখনই বিষয়টি চোখে পড়ে কিশোরীর বাবা মিজানুরের। তিনি ছেলেটিকে বাড়ির ভেতরে ডেকে নেন। এরপর তাঁর ছেলে শাকিল মিয়া রড ও প্লাস (প্লায়ার) নিয়ে আসে।
তারপর শুরু হয় নারকীয় অত্যাচার। মিজানুর ও তাঁর ছেলে শাকিল মিয়া রড দিয়ে নয়নের মাথা থেকে পা পর্যন্ত আঘাত করতে থাকে। একপর্যায়ে নয়নের পায়ের পাতার নিচে সুই ফুটিয়ে দেয় তারা। সবশেষে প্লাস দিয়ে হাত ও পায়ের নখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা চালায়। অসহ্য যন্ত্রণায় নয়নের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তাঁকে উদ্ধার করে। পরে স্থানীয়রা দ্রুত বদরগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার চিকিৎসকরা অবস্থার অবনতি দেখে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন।
বদরগঞ্জ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক নূরে আশরাফ ছিদ্দিক বলেন, ছেলেটির সারা শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন আছে। অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক, দ্রুত উন্নত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা মুকুল দাস বলেন, এমন নৃশংস অত্যাচার আমি কখনো দেখিনি। কুলাঙ্গার মিজানুরের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
আরেক স্থানীয় হরিদাস বলেন, আমাদের ছেলেটি যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে দেশে আইন আছে। এই মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। পাষণ্ড মিজানুরের বিচার চাই।
জানা গেছে, অভিযুক্ত মিজানুর আওয়ামী লীগের এক সময়ের দোসর ছিলেন। সম্প্রতি বদরগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওপর হামলার মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন।
নির্যাতনের পর থেকেই মিজানুর পলাতক। তাঁর বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে সাংবাদিকের পরিচয় পেয়ে তিনি ফোন কেটে দেন।
এ ঘটনায় নয়নের বাবা বদরগঞ্জ থানায় মিজানুর ও তাঁর ছেলে শাকিল মিয়ার নামে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। থানার ওসি হাসান জাহিদ সরকার বলেন, ভুক্তভোগী মামলা করতে চাইলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কালুপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল হক মানিক বলেন, “অন্যায়ের সঙ্গে কোনো আপস নেই। ভুক্তভোগীর পরিবারকে আইনি ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
মন্তব্য করুন