কুড়িগ্রামে দুধকুমার নদীর অব্যাহত ভাঙনে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তিন শতাধিক পরিবারের। সদর উপজেলার যাত্রাপুর ও ঘোগাদহ ইউনিয়নের ভৈষেরকুটি, খামার, ব্রহ্মত্তর, চর যাত্রাপুর, বাণিয়াপাড়াসহ অন্তত সাত থেকে আটটি গ্রামে ভয়াবহ ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বছরের পর বছর নদীভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হলেও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ছয় থেকে সাত বছর ধরে দুধকুমার নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকলেও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে শত শত পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকের আবাদি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙনকবলিতদের মধ্যে বেশিরভাগই এখনো কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি। অতীতে কিছু পরিবারকে ত্রাণ হিসেবে চাল দেওয়া হলেও পুনর্বাসনের মতো কার্যকর সহায়তা মেলেনি।
যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, গত বছর তার ইউনিয়নে শতাধিক বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছিল। তবে চলতি বছরের বন্যা ও ভাঙনে ইতোমধ্যে ২৭৫টি বাড়ি নদীতে বিলীন হলেও এখন পর্যন্ত কেউ কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি। গত ২২ জুন জেলা প্রশাসক ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে সাতজন ক্ষতিগ্রস্তকে শুকনো খাবার দিলেও এরপর আর কোনো সহায়তা দেওয়া হয়নি। আগে ভাঙনকবলিতদের জন্য টিন ও নগদ অর্থ বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে সেই সুবিধা বন্ধ রয়েছে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসকের পরিদর্শনের পর বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বাণিয়াপাড়া এলাকায় ৫০০টি জিও ব্যাগ এনে রেখেছে। তবে এখনো সেগুলো নদীতে ফেলা হয়নি। দ্রুত জিও ব্যাগ ব্যবহার না করলে ভাঙনের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।
বাণিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আখলিমা ও জব্বার শেখ বলেন, নদী প্রতিদিনই তাদের আবাদি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা গিলে খাচ্ছে। অথচ ভাঙন ঠেকাতে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। একই এলাকার জব্বার আলী বলেন, জিও ব্যাগ ভরার কাজ চলছে, কিন্তু নদীতে ফেলা হচ্ছে না। এতে নদীতীরের মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানান তিনি।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন বলেন, ভাঙনকবলিতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো পাওয়া যায়নি। তালিকা পাওয়া গেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হবে এবং যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হবে। বর্তমানে সদর উপজেলার যাত্রাপুর, ঘোগাদহ, হলোখানা, পাঁচগাছী ও মোগলবাসা ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙন চলমান রয়েছে। বিষয়টি নিয়মিত জেলা সমন্বয় সভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া ভাঙনকবলিতদের জন্য অর্থ ও ঢেউটিনের বরাদ্দ পাওয়া গেলে নীতিমালা অনুযায়ী তা বিতরণ করা হবে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে প্রায় দুই লাখ জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। বর্তমানে জেলার ৪০টি স্থানে ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ৩০টি পয়েন্টে ছয় হাজার করে জিও ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। যাত্রাপুর এলাকায় জিও ব্যাগ ভরার কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট কমিটির তদারকি শেষে দ্রুত সেগুলো নদীতে ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ শুরু করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা মৌসুমে দুধকুমারের ভাঙন আরও ভয়াবহ আকার ধারণের আগেই জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে আরও অসংখ্য বসতভিটা ও ফসলি জমি।
মন্তব্য করুন