বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা। বছরের পর বছর বিনা বেতনে কিংবা অতি সামান্য সম্মানীতে পাঠদান করেও মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো শিক্ষক। তবুও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অনেক শিক্ষক রয়েছেন, যারা ২০ থেকে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো সরকারি বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষাদান করছেন। সম্প্রতি এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলনের সময় পাবনায় এক শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে নন-এমপিও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও বঞ্চনার চিত্র।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সরকার থেকে আশ্বাস মিললেও বাস্তবে এমপিওভুক্তির কার্যকর উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। নানা জটিল প্রক্রিয়া, শর্ত ও প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে তারা এখনও বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন। অথচ শিক্ষার্থীদের পাঠদান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলাফল ভালো রাখা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পুরো দায়িত্বই তাদের কাঁধে বর্তায়।
একজন শিক্ষিকা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “৩২ বছর ধরে বিনা বেতনে চাকরি করছি। জাতির কারিগর হয়েও না খেয়ে শিক্ষা দিতে হচ্ছে।” তার এই বক্তব্য যেন দেশের হাজারো নন-এমপিও শিক্ষকের না বলা কষ্টের প্রতিচ্ছবি।
শিক্ষকরা বলছেন, একজন শিক্ষক যখন নিজের পরিবার চালাতে হিমশিম খান, তখন তার পক্ষে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও পেশার প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকেই তারা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন শিক্ষককে যদি ২০ থেকে ৩০ বছর বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাহলে সেটি শুধু অমানবিকই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অবহেলারও প্রতিচ্ছবি। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি কি কয়েক বছর বিনা বেতনে কাজ করতে রাজি হবেন? যদি না হন, তাহলে শিক্ষকদের কাছ থেকে কেন এমন ত্যাগ প্রত্যাশা করা হবে?
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এমপিওভুক্ত করা জরুরি। কারণ আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা শিক্ষক দিয়ে একটি দক্ষ ও মানবিক জাতি গঠন সম্ভব নয়।
নন-এমপিও শিক্ষকরা জানান, তারা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ চান না; তারা চান তাদের ন্যায্য অধিকার। শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন অবদান রাখার পরও যদি তারা বেতন-ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে নতুন প্রজন্মের মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হবে।
সচেতন মহলের মতে, শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি পূরণে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
শিক্ষকদের ভাষায়, “শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচাতে হলে আগে শিক্ষকদের বাঁচাতে হবে।”
মন্তব্য করুন