পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় স্বাস্থ্যসেবার নামে ভয়াবহ অনিয়ম, ভুয়া চিকিৎসক, জাল সনদধারী টেকনোলজিস্ট এবং অব্যবস্থাপনার অভিযোগ দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল হয়ে ওঠার কথা থাকলেও, উপজেলার বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে এখন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। একের পর এক অভিযানে অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসলেও কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনেসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডেন্টাল কেয়ার ও চক্ষু চিকিৎসালয়। বাহ্যিক চাকচিক্য, বড় বড় সাইনবোর্ড এবং বিশেষজ্ঞ পরিচয়ের আড়ালে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই চলছে অদক্ষ ও অনুমোদনহীন ব্যক্তিদের চিকিৎসা কার্যক্রম।
গত ১৯ আগস্ট ২০২৫ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার স্বাক্ষরে ১৫ জন ডেন্টাল টেকনোলজিস্টকে সীমিত পরিসরে দাঁতের চিকিৎসা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে তাদের কয়েকজনের সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর ১৬ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে আট সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিদর্শন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির পাঁচ সদস্যই ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা। উদ্দেশ্য ছিল বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম তদারকি করা।
পরবর্তীতে ২০ অক্টোবর ২০২৫ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানে একাধিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের প্রমাণ মেলে এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে সিলগালা করা হয়। একই বছরের ২৩ অক্টোবর একটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও, অভিযোগ রয়েছে—অদৃশ্য প্রভাবের কারণে প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতেও চালু থাকে।
এদিকে চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল সাফা বাজার এলাকার একটি ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে নোয়াখালীর ভুয়া চিকিৎসক পি.সি বর্মনকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই ঘটনায় ক্লিনিক মালিক মনির হোসেনকেও জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর ১৯ এপ্রিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে এক ব্যক্তি নিজেকে হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার সময় আটক হন। তদন্তে জানা যায়, তিনি একাধিক ভুয়া পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে রোগী দেখে আসছিলেন।
স্বাস্থ্যখাতে অনিয়মের আরেকটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগে। অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য কর্মকর্তার গাড়িচালক বেল্লাল হোসেন রোগীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি আদায় এবং সিবিসি (CBC) রিপোর্ট তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছিলেন। অথচ এ ধরনের দায়িত্ব পালনের জন্য তার কোনো প্রশিক্ষণ বা অনুমোদন নেই বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শাকিল সরোয়ার দাবি করেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ডেন্টাল টেকনোলজিস্টদের সনদের বৈধতা প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে সিভিল সার্জন ডা. মোঃ মতিউর রহমান বলেন, “অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম চললেও কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মঠবাড়িয়ার সব বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডেন্টাল কেয়ার ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের সনদ জরুরি ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া স্বাস্থ্যখাতের এই সংকট কাটবে না।
সাধারণ মানুষের ভাষ্য, তারা চিকিৎসা চান—প্রতারণা নয়। নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা চলতে থাকলে জনস্বাস্থ্য আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
মন্তব্য করুন