দীর্ঘ ১৪৬ বছরের ঐতিহ্য বহন করে আজও টিকে আছে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার জোয়ারা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী আয়ুর্বেদিক মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্র ‘জোয়ারা পাগলা গারদ’। রোগী সংকট, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব আয়ুর্বেদিক ওষুধের মাধ্যমে মানসিক রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বদুরপাড়া রাস্তার মাথা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি ১৮৮০ সালে কবিরাজ গিরিন্দ্র চন্দ্র দাশ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় এক একর জমির ওপর সরকারি অনুমোদন নিয়ে তিনি ‘কমলা ঔষধালয়’ নামে একটি আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান এবং সংলগ্ন মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলেন। একই সময়ে কবিরাজ চিত্তরঞ্জন দাশ প্রতিষ্ঠা করেন ‘দামোদর ঔষধালয়’ ও পাগলা গারদ। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে ‘নিশি বৈদ্যের বাড়ি’ নামেও পরিচিতি লাভ করে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে পাঁচজন নারী ও পাঁচজন পুরুষসহ মোট ১০ জন মানসিক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ১৬টি ছোট কক্ষবিশিষ্ট এই কেন্দ্রে দীর্ঘমেয়াদে রোগীদের আবাসন, চিকিৎসা, খাদ্য ও পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সুধীর সেন জানান, এখানে সম্পূর্ণ নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রস্তুতকৃত আয়ুর্বেদিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। বৃক্ষ, লতাগুল্ম ও বিভিন্ন ভেষজ উপাদান দিয়ে তৈরি এসব ওষুধের বাইরে কোনো এলোপ্যাথিক ওষুধ রোগীদের দেওয়া হয় না।
তিনি জানান, বর্তমানে রাঙ্গুনিয়ার রচনা দাশ প্রায় ২০ বছর, দোহাজারীর রত্না চক্রবর্তী দুই বছর, পটিয়ার মিজানুর রহমান দুই মাস এবং হাসিনা বেগম ছয় বছর ধরে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সুধীর সেনের দাবি, স্বাধীনতার পর থেকে এ প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুই হাজার মানসিক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, সরকারি অনুদান কিংবা কোনো দাতা সংস্থার সহযোগিতা ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। কোনো রোগীর অবস্থা জটিল হলে তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতাল অথবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
তার ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক রোগীর পরিবার নিয়মিত ব্যয় বহন করলেও কেউ কেউ রোগী ভর্তি করিয়ে পরে আর খোঁজও নেন না। তবুও নিয়মিত ওষুধ, খাবার ও প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হয়।
তিনি দাবি করেন, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার মাধ্যমে মানসিক রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশ সুস্থ হওয়ার নজির রয়েছে। তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর অভাবে সেবার পরিধি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
সরকারের কাছে একটি আধুনিক ওষুধ প্রস্তুতকারী মেশিন এবং একটি অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহের দাবি জানিয়ে সুধীর সেন বলেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে দেশের একমাত্র ঐতিহ্যবাহী আয়ুর্বেদিক মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রটি আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে এবং জাতীয় পর্যায়ে আরও পরিচিতি লাভ করবে।
মন্তব্য করুন