টানা অতি ভারী বর্ষণে গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক, বসতবাড়ি, দোকানপাট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দা ও পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। স্থানীয়দের দাবি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণেই সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
রোববার (১২ জুলাই) পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হরতকিতলা, আমতলা, ফজর আলী স্কুল সংলগ্ন এলাকা, মাইওয়ান মোড়, হরিণহাটি, জোড়াপাম্প, বিশ্বাসপাড়া, ভাঙা মসজিদ, আনসার একাডেমি, পল্লীবিদ্যুৎ, নিশ্চিতপুর, হাবিবপুর, রূপনগর, শিয়ালপাড়া, ডাইনকিনী, দিঘীরপাড় বটতলা ও পূর্ব চান্দরাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। এতে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
জলাবদ্ধতার কারণে বহু পরিবারের ঘরে পানি ঢুকে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সড়কে পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মজীবী মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
হরতকিতলা এলাকার বাসিন্দা সিয়াম জানান, কোমরসমান পানি ঘরে ঢুকে পড়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে।
বিশ্বাসপাড়া এলাকার বাসিন্দা আফাজ উদ্দিন বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। কয়েকদিন ধরে পানি জমে থাকলেও স্থায়ী কোনো সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না।
হাবিবপুর এলাকার বাসিন্দা আমেনা বেগম বলেন, অনেক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। শ্রমিকদের হাঁটুপানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খাল ও জলাশয় ভরাট, পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হচ্ছে না। বিশেষ করে বিশ্বাসপাড়া, হরিণহাটি ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর মুখ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় পানি আটকে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেও পানি প্রবেশ করেছে। এতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলা মোটর মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক এবং কালিয়াকৈর পৌরসভার মেয়র পদপ্রার্থী দেওয়ান জসিম উদ্দিন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পানি নিষ্কাশনের কাজ চলছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও এতে অংশ নিয়েছেন।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক এএইচএম ফখরুল হোসাইন বলেন, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে খালগুলোর পানি ধারণক্ষমতা অতিক্রম করেছে। ফলে পানি দ্রুত নামতে পারছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ড্রেন পরিষ্কার, খাল থেকে প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং পানি নিষ্কাশনের কাজ চলমান রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে খাল পুনঃখনন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী দ্রুত খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতা অপসারণের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কালিয়াকৈরের মানুষকে একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।
মন্তব্য করুন