জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া কুড়িগ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থী ও স্কাউট সদস্য রাজিব উল করিম সরকার (রাব্বী)-এর স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তার পরিবারকে। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন মা জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি বলেন, “কোনো মা-বাবাকে যেন আর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। দেশে এমন পরিবেশ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, যাতে আর কোনো পরিবারকে সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে না হয়।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের গালিচার ওপর দাঁড়িয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা যেন কখনো সেই রক্তের সঙ্গে বেঈমানি না করে। আল্লাহ যেন এমন দিন না দেখান। যারা বেঈমানি করবে, তাদের পরিণতিও ইতিহাসে যেমন হয়েছে, তেমনই হবে।”
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের জয়কুমার গ্রামের বাসিন্দা রাজিব উল করিম সরকার রাব্বী বাবা-মায়ের চাকরির সুবাদে লালমনিরহাটে বেড়ে ওঠেন। তিনি লালমনিরহাট সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট তিনি ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন। পরদিন ৫ আগস্ট লালমনিরহাটের মিশন মোড়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ হন। পরে গভীর রাতে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন খানের বাসা থেকে আগুনে পোড়া অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রাজিবের মা বলেন, ৫ আগস্ট রাত ১১টার পর থেকে ছেলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
তিনি বলেন, “আমার ছোট ছেলে আমাকে বলেছিল, বিপদে পড়লে একটি দোয়া পড়তে। আমি সঙ্গে সঙ্গে জায়নামাজে বসে দোয়া পড়তে শুরু করি। একই সময় ফেসবুকে পোস্ট দিই—‘রাজিবকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কেউ পেলে জানাবেন।’ রাত দেড়টার দিকে আমার ছোট দেবর ফোন করে কান্না শুরু করলে আমি বুঝতে পারি, আমার ছেলেটা আর নেই। আমি জায়নামাজে বসেই ছেলের মৃত্যুর খবর পাই।”
তিনি আরও বলেন, “আমার ছেলের চুল বা দাড়ি পুড়ে যায়নি। শুধু ধোঁয়া আর আগুনে তার শরীর কালো হয়ে গিয়েছিল। সেই দৃশ্য আজও ভুলতে পারি না।”
রাজিবের শৈশব স্মরণ করে জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, চাকরির কারণে দীর্ঘদিন তিনি ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে আলাদা থাকতেন। বড় ছেলে রাজিব বাবার কাছেই বড় হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি ছেলের যত্ন করতে পারিনি। ওর বাবাই তাকে মানুষ করেছে। রান্না থেকে শুরু করে সব কাজ নিজেই করত। লেখাপড়া, স্কাউটিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই সে ছিল অসাধারণ। প্রেসিডেন্ট স্কাউট অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিল।”
রাজিবের মা জানান, ছেলের স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। রক্ত দেখলে ভয় পেত বলে চিকিৎসক হতে চাইত না।
তিনি বলেন, “ও বলেছিল, একদিন নিজের হাতে আমাদের বাড়ির সুন্দর একটি নকশা করবে। ওর অনেক বন্ধু বুয়েটে সুযোগ পেয়েছে। আমার বিশ্বাস, রাজিবও পারত।”
রাজিবের বাবা রেজাউল করিম সরকার, যিনি লালমনিরহাটের বেগম কামরুন্নেছা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক, আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন,
“আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অথচ স্বাধীন দেশে আবার স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করতে হলো। রাজিব শুধু আমার ছেলে ছিল না, সে ছিল আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু। তাকে আমি নিজ হাতে বড় করেছি। আজও তাকে ভুলতে পারিনি।”
তিনি বলেন, “ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
ছোট ভাই মেজবাহ উল করিম সরকার বলেন, “ভাইয়ার সঙ্গে মাছ ধরতাম, পাখি পালন করতাম। বাইরে কাঁদতে পারি না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন কাঁদি।”
মেঝো ভাই জামিউল করিম সরকার বলেন, “৪ আগস্ট ভাইয়া বলেছিল আন্দোলনে যাবে। আমাদের যেতে দেয়নি। পরে ফেসবুক লাইভে দেখি, সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ভাইয়া ধরা পড়েছে। তখন বুঝতে পারি, সে আন্দোলনে ছিল।”
রাজারহাট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক আল মিজান বলেন, জুলাই আন্দোলনে কুড়িগ্রামে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১৩৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাজারহাট উপজেলায় আহত হন ১১৪ জন এবং শহীদ হন একজন—রাজিব।
তিনি বলেন, *“প্রকৃত জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে কেউ যেন ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।”
মন্তব্য করুন