
পরকীয়ার সম্পর্কের জেরে কবিরাজ মো. মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ (৪০)কে নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ টুকরো টুকরো করে গুম করার বহুল আলোচিত মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি মোসা. মাকসুদা আক্তার লাকি ওরফে হাসিনাকে (৩৯) দীর্ঘ আট বছর পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার করেছে সাভার মডেল থানা পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সাভারের হেমায়েতপুর বাগবাড়ি এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরমান আলীর নির্দেশনায় পরিচালিত এই অভিযানে ওয়ারেন্ট অফিসার এসআই আশরাফুল ইসলাম, এসআই সাখাওয়াত ইমতিয়াজ ও এসআই মতিউর রহমানসহ একটি চৌকস পুলিশ টিম অংশ নেয়। গ্রেপ্তারকৃত লাকি সাভার উপজেলার তেঁতুলঝরা ইউনিয়নের হেমায়েতপুর যাদুরচর এলাকার আলী আহমেদের মেয়ে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
মামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জ থানাধীন তারানগর ইউনিয়নের বেউতা গণকবরস্থানের পাশের একটি ডোবা থেকে দুই হাত, দুই পা ও মাথাবিহীন একটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তৎকালীন এসআই মেহেদী হাসান বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে, মরদেহটি সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের কাইসারচর ডুমরাকান্দা এলাকার বাসিন্দা মতিউর রহমানের ছেলে কবিরাজ মো. মফিজুর রহমান ওরফে মফিজের।
তদন্তে প্রকাশ পায় চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রবাসে থাকা স্বামীর অনুপস্থিতিতে সন্তান লাভের আশায় চিকিৎসার জন্য কবিরাজ মফিজের কাছে যাতায়াত করতেন লাকি। চিকিৎসার সূত্রে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে তা প্রেম ও দৈহিক সম্পর্কে রূপ নেয়। পরে স্বামী দেশে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হলে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে মফিজ বিভিন্নভাবে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেন এবং কবিরাজি ক্ষমতার কথা বলে ভয়ভীতি দেখান—এমন অভিযোগ ওঠে। এতে আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে লাকি তার দেবর সালাউদ্দিন ও সহযোগী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করে মফিজকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ‘থার্টি ফার্স্ট’ উদযাপনের কথা বলে মফিজকে বাসায় ডেকে আনা হয়। চা ও গরুর মাংসের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর তিনি অচেতন হয়ে পড়লে ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়। পরে পরিচয় গোপন রাখতে নির্মমভাবে লাশের মাথা, হাত-পা ও শরীরের অংশ কেটে ফেলা হয়। মাথা কেরানীগঞ্জের নিমতলী ব্রিজের পাশে এবং দেহের অন্যান্য অংশ বেউতা এলাকার গণকবরস্থানের পাশের ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর পুলিশ তিন আসামিকেই গ্রেপ্তার করে এবং তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান তারা। মামলার বিচার শেষে আদালত লাকি, সালাউদ্দিন ও নজরুল ইসলাম—তিনজনকেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। এর মধ্যে নজরুল ইসলাম মারা যান, সালাউদ্দিন নাম পরিবর্তন করে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান এবং লাকি নিজের পরিচয় বদলে ‘হাসিনা’ নামে ইতালি প্রবাসী হন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে করে সম্প্রতি দেশে ফিরে পুনরায় বিয়ে করে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।
তবে শেষ রক্ষা হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন নজরদারির মাধ্যমে পুলিশ তার অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এ বিষয়ে ওসি আরমান আলী বলেন, “পরিচয় পরিবর্তন করলেও আইনের হাত থেকে কেউ রক্ষা পায় না। দীর্ঘদিন পলাতক থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দীর্ঘ আট বছর পর নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। স্থানীয়দের মতে, পুলিশের এই সাফল্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পেশাদারিত্ব ও দৃঢ়তারই প্রমাণ।
মন্তব্য করুন