রাজধানীর মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিংয়ে রাজউকের নির্দেশনা অমান্য করে নকশাবহির্ভূত অংশ পুনরায় নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্লট মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। একই সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভবনটির সব ধরনের নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও ব্যবহার কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, এ ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জন্য প্রতিবেদককে হত্যার পর লাশ গুম এবং ফৌজদারি মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভবন মালিক কাউসারের শ্বশুরের বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় পর্বের প্লট নম্বর ৩৪, রোড নম্বর এন-৫, ব্লক-এইচ এলাকায় ভবনটির নির্মাণকাজ চলছিল। রাজউকের অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণকাজ করায় গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে রাজউক। এ সময় ভবনের নকশাবহির্ভূত একটি অংশ ভেঙে অপসারণ করা হয়।
পাশাপাশি অবশিষ্ট নকশাবহির্ভূত অংশ নিজ দায়িত্বে অপসারণের জন্য প্লট মালিককে অঙ্গীকারনামা দিতে বলা হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে রাজউকের সরেজমিন পরিদর্শনে অভিযোগের সত্যতা মেলে যে, অবৈধ অংশ পুরোপুরি অপসারণ না করে উল্টো সেখানে পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে।
এ ঘটনায় গত ১০ জুন রাজউক প্লট মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। নোটিশে অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়াকে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮-এর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
নোটিশে আগামী সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভবনটির সব ধরনের নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও ব্যবহার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
রাজউক সতর্ক করেছে, নির্দেশনা না মানলে ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিবেদককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভবন মালিক কাউসারের শ্বশুরের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিবেদকের অফিসে এসে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ বা বাড়াবাড়ি করা হলে প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দেওয়া হবে। পাশাপাশি দলীয় লোকজন দিয়ে পথে-ঘাটে অপহরণ করে হত্যার পর লাশ গুম করারও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ডিবি পুলিশ বা র্যাব দিয়ে গ্রেপ্তার করিয়ে সারাজীবনের জন্য সাংবাদিকতা ও সংবাদ প্রকাশের ‘স্বাদ মিটিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকের ওপর এমন হুমকির ঘটনায় সংবাদকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো অভিযোগ বা অনিয়মের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিককে ভয়ভীতি বা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য গুরুতর হুমকি।
ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া কিংবা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সম্প্রতি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬ জারি হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশে অনুমোদিত নকশার বাইরে স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশের ৫৪ ধারায় অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে। পাশাপাশি রাজউকের কোনো কর্মকর্তা জেনেশুনে নকশাবহির্ভূত নির্মাণে সহায়তা করলে বা দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব থাকলে তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
রাজধানীতে অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রাজউকের বিভিন্ন জরিপেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভবনে নকশার ব্যত্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে।
রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও পল্লবী এলাকায় নকশার ব্যত্যয় ঘটানো ভবনের হার প্রায় ৯৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। রামপুরা, মতিঝিল ও খিলগাঁও এলাকায় এ হার প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং ধানমন্ডি এলাকায় প্রায় ৮৯ শতাংশ।
এ ছাড়া ১০ তলার বেশি উচ্চতার ১ হাজার ৮১৮টি বহুতল ভবনের মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ ভবনেই অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় পাওয়ার কথা জানিয়েছে রাজউক।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণকাজ হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা জরুরি। কিন্তু তদারকির ঘাটতি ও বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের কারণে নকশাবহির্ভূত নির্মাণ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রাজউকের মূল নিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু আইন পরিবর্তন নয়, আইন বাস্তবায়নে প্রশাসনিক কাঠামো ও তদারকি ব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি।
অন্যদিকে পরিবেশ ও আইন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনুমোদনহীন বা নকশাবহির্ভূত নির্মাণ ঠেকাতে রাজউকের নিয়মিত নজরদারি এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ইস্টার্ন হাউজিংয়ের এই ঘটনায় রাজউকের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অবৈধ অংশ অপসারণের পরও পুনরায় নির্মাণকাজ শুরুর অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। রাজউকের কারণ দর্শানোর নোটিশের পর ভবন মালিক কী জবাব দেন এবং পরবর্তী সময়ে সংস্থাটি কী ব্যবস্থা নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
একই সঙ্গে প্রতিবেদককে হত্যার পর লাশ গুমের হুমকির অভিযোগের বিষয়েও দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন