চোখে আলো নেই, কিন্তু স্বপ্ন দেখার শক্তি অটুট। অসংখ্য বাধা, অপমান আর প্রতিকূলতাকে জয় করে এবার এইচএসসি (আলিম) পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হাফেজ মো. মারুফ উল্যাহ। শুধু নিজের জন্য নয়, ভবিষ্যতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করার স্বপ্নও দেখছেন তিনি।
শুক্রবার (৩ জুলাই) কুড়িগ্রামের রাজারহাট ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে শ্রুতি লেখক হিসেবে ভাতিজি ছুম্মা আক্তারের সহায়তায় পরীক্ষায় অংশ নেন মারুফ। তার এই সংগ্রামী জীবন ইতোমধ্যে এলাকায় অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বুজরুক নূরপুর গ্রামের বাসিন্দা মারুফ উল্যাহ। পরিবারের দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছোট। বাবা গোলজার হোসেন ২০১৯ সালে মারা যান। মা শাহজাদি বেগমের উৎসাহ এবং প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় তিনি শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করেছেন।
মারুফ বলেন, চোখে দেখতে না পারায় ছোটবেলার স্কুল থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। অনেক শিক্ষকই বলেছিলেন, ‘চোখে দেখো না, তোমার দিয়ে পড়াশোনা হবে না।’ সহপাঠীদের কটূক্তি, অবহেলা ও নানা ধরনের মানসিক নির্যাতনের মধ্যেও তিনি পড়াশোনা ছাড়েননি।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে পরীক্ষায় পাস করাটাই মূল লক্ষ্য ছিল না, জ্ঞান অর্জনই ছিল সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য। সবাই পারলে আমি কেন পারব না—এই জেদই আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।’
বাড়ির পাশের বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার পর তিনি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করলেও সব জায়গায় সমান পরিবেশ পাননি। তবে ২০২২ সালে ফরিদপুর আব্দুল্লাহ দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা তাকে নতুন করে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। পরবর্তীতে কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হন।
মারুফ বলেন, ‘আমি যদি কখনো সুযোগ পাই, তাহলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার জন্য কাজ করব। আমি চাই না, অন্য কেউ আমার মতো অপমান ও কষ্টের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করুক।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবন্ধী বলে নিজেকে ছোট ভাবার কোনো সুযোগ নেই। পড়াশোনা মানুষকে আত্মমর্যাদা দেয়, নিজের মত প্রকাশের সাহস দেয় এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার পথ দেখায়।’
কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদ্রাসার মোফাচ্ছির মাজিদুর রহমান বলেন, ‘প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মারুফের শেখার আগ্রহ ও মেধা আমাদের মুগ্ধ করেছে। সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আমরা আশাবাদী।’
রাজারহাট ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. আব্দুল হাই জানান, এ বছর তাদের কেন্দ্রে ৩২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন। শ্রুতি লেখকের সহায়তায় তিনি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পরীক্ষা দিয়েছেন।
সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক হয়ে ওঠা মারুফের গল্প প্রমাণ করে—শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, দৃঢ় মনোবলই মানুষকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়।
মন্তব্য করুন