হাকালুকি হাওর জুড়ে এখন ধান কাটার উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা ছিল। সোনালি ধানের সুবাসে ভরে ওঠার কথা ছিল কৃষকের উঠান। কিন্তু অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের আঘাতে সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। সিলেট বিভাগের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলজুড়ে দেখা দিয়েছে কৃষকের বুকফাটা আহাজারি। পানির নিচে তলিয়ে গেছে বোরো ধানের ক্ষেত, অনিশ্চয়তায় পড়েছে হাজারো কৃষক পরিবারের ভবিষ্যৎ।
মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাওর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানিতে ডুবে গেছে। অনেক স্থানে কৃষকরা ধান পাকানোর আগেই বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কাটছেন। তবে পানিতে ভেজা সেই ধান থেকে আদৌ চাল পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে গভীর শঙ্কা।
হাকালুকি হাওরপাড়ের কৃষক খছরু মিয়া (৫৪), আমজাদ হোসেন (৫৫) ও আলী হোসেনসহ অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সারা বছরের একমাত্র অবলম্বন ছিল এই বোরো ফসল। এনজিও থেকে ঋণ, ধার-দেনা ও সুদে টাকা এনে তারা জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ অকাল বন্যায় সেই ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় তারা এখন চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
কৃষকরা বলেন, “সারা বছরের কষ্টের ফসল শেষ হয়ে গেছে। এখন সংসার চালাব কীভাবে, ঋণ শোধ করব কীভাবে, সেই চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে গেছে। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই এখন বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছরই হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার ঝুঁকি থাকলেও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। ফলে সামান্য অতিবৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢলেই বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয় কৃষকদের। অনেকেই বলছেন, ফসল রক্ষা বাঁধ আরও শক্তিশালী ও টেকসই হলে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।
এদিকে কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জুড়ী উপজেলা-এ প্রায় ৬ হাজার ১৮৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছিল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু কয়েক দিনের টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জুড়ী নদী দিয়ে হাকালুকি হাওরে পানি প্রবেশ করায় শত শত হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যায়।
জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৭৪ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে তাদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষি বিভাগ সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের এই দুর্দশা শুধু একটি অঞ্চলের সংকট নয়, বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের সতর্ক সংকেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন