কুড়িগ্রামের দুর্গম চরাঞ্চলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ। সংস্থাটি জেলার সদর, উলিপুর ও রৌমারী উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ১৪টি চর এলাকায় বিভিন্ন সচেতনতামূলক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব উদ্যোগের ফলে ইতোমধ্যে ২৩টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
নদীভাঙন, দারিদ্র্য, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া এবং সামাজিক কুসংস্কারের কারণে চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বাল্যবিবাহ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় ফ্রেন্ডশিপ স্থানীয়ভাবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি, স্কুল ওয়াচ কমিটি এবং আইনি সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১০৯ জন ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরীর তালিকা প্রস্তুত করে তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি চরে স্কুল ওয়াচ কমিটির মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীদের চিহ্নিত করে তাদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
সরেজমিনে যাত্রাপুর ইউনিয়নের খেয়ার আলগা চরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ফ্রেন্ডশিপের উদ্যোগে একটি আইনি সহায়তা কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা ফ্রেন্ডশিপের কমিউনিটি প্যারালিগ্যাল কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম জানান, প্রায় সাড়ে তিনশ পরিবার অধ্যুষিত এই চরে বাল্যবিবাহ, পারিবারিক বিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানে তারা কাজ করছেন। কোথাও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের খবর পেলেই সংশ্লিষ্ট পরিবারকে কাউন্সেলিং করা হয়। প্রয়োজন হলে প্রশাসনের সহযোগিতাও নেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মোছা. শাহিনা আক্তার জানান, চরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় তার ছেলে ফ্রেন্ডশিপ পরিচালিত বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। আর মেয়েকে উচ্চশিক্ষার জন্য কুড়িগ্রাম শহরে রেখে পড়াতে হচ্ছে। বর্তমানে সে কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে।
স্থানীয় কৃষক মাহবুব আলম বলেন, “আমার মেয়েটা খুব মেধাবী ছিল। কিন্তু এখানে মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় নদী পার হয়ে অনেক দূরে যেতে হতো। নিরাপত্তা ও আর্থিক সমস্যার কারণে অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়াতে পারিনি। পরে মেয়েকে বিয়ে দিতে হয়েছে। বিষয়টি এখনো আমাকে কষ্ট দেয়।”
ফ্রেন্ডশিপের এরিয়া রিজিওনাল ম্যানেজার নাঈম কামরান বলেন, “চরাঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে একসময় বাল্যবিবাহের হার অনেক বেশি ছিল। আমরা শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। কোথাও বাল্যবিবাহের আশঙ্কা দেখা দিলে স্থানীয় প্রতিনিধি ও প্রতিরোধ কমিটি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।”
ফ্রেন্ডশিপের টিম লিডার রুম্মানুল ফেরদৌস জানান, শিক্ষা, আইনি সহায়তা, সামাজিক সচেতনতা ও পরিবেশ উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই সংস্থাটি কাজ করছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নিয়মিত উঠান বৈঠক, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইনি সহায়তা কেন্দ্র পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ প্রকল্পের আওতায় চরাঞ্চলে সচেতনতামূলক বিলবোর্ড স্থাপন, কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম, পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ, সরকারি কর্মকর্তাদের চর পরিদর্শন এবং পথনাটকের আয়োজন করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত ১৮টি পথনাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হয়েছে।
এসব কার্যক্রমের সুফল হিসেবে আদুরী আক্তার, স্বপ্না খাতুন, নিলুফা আক্তার নূরী ও মারুফা আক্তারের মতো অনেক কিশোরী বাল্যবিবাহের ঝুঁকি থেকে ফিরে এসে আবারও শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, একসময় চরাঞ্চলে গোপনে অনেক বাল্যবিবাহ সংঘটিত হলেও বর্তমানে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার হওয়ায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে দুর্গম চরাঞ্চলে বাল্যবিবাহের হার আরও কমে আসবে।
মন্তব্য করুন