যে বয়সে বই-খাতা আর স্কুলব্যাগ নিয়ে রঙিন শৈশব কাটানোর কথা, সেই বয়সেই ৮ বছরের হ্নদয় চন্দ্র সরকারের কাঁধে উঠেছে ছয় সদস্যের পরিবারের দায়িত্ব। অভাব-অনটনের নির্মম বাস্তবতা তাকে সময়ের আগেই বড় করে তুলেছে। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন মোটরসাইকেল গ্যারেজে কঠোর পরিশ্রম করছে শিশুটি।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত নাগদহ গ্রামের একটি ভাঙাচোরা ঘরে বসবাস সুশান্ত কুমার সরকারের পরিবারের। ছয় সদস্যের এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে। পরিবারের তিনজন শারীরিক প্রতিবন্ধী—সুশান্ত কুমার নিজে এবং তার দুই সন্তান।
প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় সুশান্ত কুমার পাশের চিলমারী উপজেলায় একটি রুটি কারখানায় কাজ করেন। তবে হাত-পায়ের জটিলতার কারণে অন্যদের মতো শারীরিক পরিশ্রম করতে না পারায় তার কাজ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পরে তার পারিবারিক দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে সহকর্মীদের অনুরোধে কারখানার মালিক তাকে সামান্য বেতনে কাজে বহাল রাখেন। তবে সেই আয় দিয়ে নিজের খরচই চালাতে পারেন না তিনি।
অন্যদিকে, পরিবারের খাবারের জোগান দিতে বিভিন্ন বাড়িতে টুকটাক কাজ করেন সুশান্তের স্ত্রী শিখা রানী। কখনো এক সের, কখনো আধা সের চাল মজুরি হিসেবে পান। সেই চাল দিয়েই কোনো রকমে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেন তিনি।
এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যে পরিবারের বড় সন্তান ৮ বছরের হ্নদয় চন্দ্র সরকার এখন উলিপুর শহরের একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে কাজ করছে। সারাদিন পরিশ্রম করে যে সামান্য আয় করে, সেটিই ছয় সদস্যের পরিবারের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন। কখনো খাবার জোটে, আবার কখনো না খেয়েই দিন কাটে পরিবারটির।
শিশু হ্নদয় জানায়, “আমার পরিবারের জন্য আমি এই দোকানে কাজ করতেছি। আমার বাবা পঙ্গু, আমার ভাই পঙ্গু। এজন্য আমি পরিবারের জন্য এই কাজ করতেছি।”
মোটরসাইকেল গ্যারেজের মালিক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “এই ছেলের পরিবার গরিব। বাবা প্রতিবন্ধী। পরিবারের চারজনের মধ্যে সে বড়। আমার এখানে কাজ করে যে দু-চার পয়সা আয় করে, তাই দিয়ে সংসার চালায় সে।”
আক্ষেপ করে হ্নদয়ের বাবা সুশান্ত কুমার সরকার বলেন, “আর দশটা মানুষ যে কাজ করতে পারে, আমি সেই কাজ করতে পারি না। আমার বাবা-মা নেই। চারটি সন্তানের মধ্যে দুটি সন্তান আমার মতো পঙ্গু হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে ৮ বছরের বড় ছেলেকে মোটরসাইকেল গ্যারেজে দিয়েছি।”
হ্নদয়ের মা শিখা রানী বলেন, “বাড়িতে অভাব লেগেই আছে। যা জোগাড় করি, অনেক সময় নিজে না খেয়ে সন্তানদের খাওয়াই। সন্তানেরা ভালো-মন্দ খেতে চায়, দিতে পারি না। তখন বুকটা ফেটে যায়।”
প্রতিবেশী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “আমার বাড়ির পাশে সুশান্তের বাড়ি। খুবই অভাবী সংসার। আমি তার কষ্ট লাঘবে যে ফ্যাক্টরিতে কাজ করি, সেখানে তাকে কাজ জুটিয়ে দিয়েছি। প্রতি শুক্রবার আমি তাকে আমার মোটরসাইকেলে পাশের চিলমারী উপজেলায় কাজে নিয়ে যাই এবং বুধবার সন্ধ্যায় বাড়িতে পৌঁছে দিই। সে ছয় দিন ফ্যাক্টরিতে টুকটাক কাজ করে।”
আরেক প্রতিবেশী অরবিন্দ রায় বলেন, “এটি একটি দুস্থ পরিবার। প্রতিবেশীরাও অভাবগ্রস্ত। ফলে তাদের সহযোগিতা করার মতো কেউ নেই। দেশের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে পরিবারটি স্বচ্ছন্দে চলতে পারবে।”
গুনাইগাছ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সোলায়মান আলী বলেন, “ওদের পরিবারের মধ্যে তিনজন প্রতিবন্ধী। বর্তমানে দুধের বাচ্চাটা সংসার চালায়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যতটুকু পারি আমি সহযোগিতা করি। যদি কোনো বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষ পাশে দাঁড়ান, তাহলে সংসারটি ভালোভাবে চলবে।”
পরিবারটির এমন অসহায় অবস্থায় শিশুটির কাঁধে পরিবারের দায়িত্ব না দিয়ে তার পড়াশোনা ও স্বাভাবিক শৈশব নিশ্চিত করতে সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসবেন—এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।
মন্তব্য করুন