মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সমগ্র সৃষ্টি তথা বিশ্বমানবের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের কল্যাণ ও মুক্তির বার্তা নিয়ে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার প্রিয় নবী, শেষ নবী ও রহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) পৃথিবীতে আগমন করেন। তাঁর আগমন ছিল মানবজাতির জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহ।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)। এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট হয়, মহানবী (সা.) কোনো নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী বা ভূখণ্ডের জন্য নন; তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন।
হযরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে নবুয়তের যে ধারা শুরু হয়েছিল, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের মধ্য দিয়ে সেই ধারার সমাপ্তি ঘটে। তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তাঁর পরে আর কোনো নবী পৃথিবীতে আগমন করবেন না। পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণ নির্দিষ্ট জাতি বা সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত হলেও মহানবী (সা.)-কে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র জাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি।’ (সূরা সাবা, আয়াত: ২৮)। একইভাবে হযরত ঈসা (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁর আগমনের সুসংবাদও দেওয়া হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আমার পরে এমন একজন রাসুল আসবেন, যার নাম হবে আহমদ।’ (সূরা আস-সফ, আয়াত: ৬)।
মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্যায়, শোষণ ও হানাহানি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া, দুর্বলদের ওপর নির্যাতন, নারীর অধিকার হরণ, গোত্রীয় সংঘাত ও প্রতিহিংসা ছিল সমাজের নিত্যচিত্র। এমন অন্ধকার সময়ে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবকে ‘সিরাজুম মুনিরা’ বা আলোকোজ্জ্বল প্রদীপরূপে প্রেরণ করেন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও আলোকোজ্জ্বল প্রদীপরূপে প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আহজাব, আয়াত: ৪৫-৪৬)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের মধ্যে সত্য, ন্যায়, মানবতা ও নৈতিকতার শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি মিথ্যা, অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্য থেকে মানুষকে দূরে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর চরিত্র ছিল সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমা, দয়া, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের অনন্য দৃষ্টান্ত।
মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল মানবতার জন্য বাস্তব আদর্শ। তিনি শুধু ধর্মীয় শিক্ষা দেননি; বরং পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণমুখী জীবনব্যবস্থার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
মদিনায় হিজরতের পর ঐতিহাসিক মদিনা সনদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, অধিকার ও দায়িত্বের একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বে সামাজিক ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত সমাজ গড়ে উঠেছিল।
আজকের পৃথিবীতেও মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। সমাজে যখন বৈষম্য, অন্যায়, হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও অধিকারবঞ্চনা দেখা দেয়, তখন তাঁর শিক্ষা আমাদের শান্তি, ন্যায় ও মানবিকতার পথে ফিরে আসার দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে মহানবীকে স্মরণ করার দিন নয়; বরং তাঁর জীবন, আদর্শ ও শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের প্রত্যয় গ্রহণেরও একটি সুযোগ। রাসুলপ্রেম কেবল মুখের দাবিতে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর সুন্নাহ, চরিত্র ও মানবিক আদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়েই সেই ভালোবাসার বাস্তব প্রকাশ ঘটাতে হবে।
বর্তমান মুসলিম উম্মাহর নানা সংকট ও বিভাজনের সময়ে মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা আমাদের ঐক্য, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির পথে পরিচালিত করতে পারে। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হওয়া উচিত আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।
আজ দেশের বিপুল মানুষ যখন দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নানা সামাজিক সংকটে রয়েছে, তখন মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা থেকে আমাদের শিখতে হবে কীভাবে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা যায়, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো যায় এবং সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।
প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আমাদের ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সেই ভালোবাসাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে বাস্তব রূপ দিতে হবে। বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠের পাশাপাশি তাঁর সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা, দয়া ও মানবিকতার শিক্ষা নিজেদের জীবনে ধারণ করতে হবে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভাগমন নিঃসন্দেহে বিশ্বমানবতার জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত। তাঁর জীবন ও আদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়েই সেই রহমতের যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আমাদের সবার জীবনে শান্তি, সম্প্রীতি, মানবতা ও কল্যাণের বার্তা বয়ে আনুক—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট। সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট। সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট। সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।
মন্তব্য করুন