মোংলা নদী পারাপারে সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘদিনের চরম ভোগান্তি, অব্যবস্থাপনা ও জীবনের ঝুঁকি নিরসনে জরুরি হস্তক্ষেপ করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। যাত্রীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে রোববার (১০ মে) বিকেলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ভবনের সভা কক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ হিসেবে নতুন পল্টুন, ঘাট নির্মান ও ২৪ ঘন্টা ফেরি চালু রাখা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্থাপনা তৈরীর ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি জরুরী সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসককে প্রধান করে ৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। যা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন ও সমস্যা সমাধানের আশ্বাস প্রতিমন্ত্রী সহ সরকারের অন্যান্য কর্মকর্তাদের।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ রাতেন-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম।
বিশেষ গুরুত্ব বিবেচনায় সভায় খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আব্দুল্লাহ হারুন, সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ মনিরুজ্জামান, বিআইডব্লিউটি এর নির্বাহী প্রকৌশলী রিধি রুবাইয়াত সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (মেম্বার হারবার ও মেরিন) কমডোর মোঃ শফিকুল ইসলাম সরকার, সড়ক ও জনপদের নির্বাহী প্রকৌশলী আশ্রাফুল ইসলাম, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ তারভির আলম সহ মোংলা বন্দর ইপিজেড কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা, মোংলা পোর্ট পৌরসভার প্রশাসক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমী, পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মানিক চন্দ্র গাইন,উপজেলা বিএনপির সভাপতি আঃ মান্নান হাওলাদার, পৌর সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিক সহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় মোংলা নদীর দুই পাড়ের মানুষের পারাপার সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে বেশ কিছু যুগান্তকারী প্রস্তাবনা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, দুই পাড়ে জরুরি পল্টুন স্থাপন, আগামী সাত দিনের মধ্যে যাত্রী ওঠানামার সুবিধার্থে নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নতুন পল্টুন স্থাপনের কাজ শুরু করারও প্রস্তাবনা রয়েছে। ২৪ ঘণ্টা ফেরি সার্ভিস, সাধারণ যাত্রী ও জরুরি যানবাহন পারাপারে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ফেরি সার্ভিস চালু রাখার প্রস্তাবনা গৃহিত হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নদীর দুই পাড়ে নতুন পাকা জেটি এবং কাঠের ঘাট নির্মাণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সকল প্রস্তাবনা বিবেচনা করে কোনটি সঠিক হয় সে ব্যাপারে ৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। যা যাত্রী পারাপারের ভোগান্তি কেন হচ্ছে এবং স্থায়ীভাবে কীভাবে এটি নিরসন করা যায়, তা পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি নিয়মিত তদারকি করবে এবং জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে।
সভায় খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আব্দুল্লাহ হারুন প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর তদারকির আশ্বাস দিয়ে বলেন, মোংলা নদী পারাপারের সমস্যাটি কেবল স্থানীয় নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ মোংলা বন্দরের সাথে সরাসরি জড়িত। সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা ও ভোগান্তি লাঘবে আমরা শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি গ্রহণ করছি। তিনি আরও যোগ করেন, ৭ সদস্যের যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদের মূল কাজ হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফেরি সার্ভিস এবং ঘাট ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করা। আমরা কোনো দীর্ঘসূত্রিতা চাই না। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকেও ঘাটে অতিরিক্ত ভিড় এবং অব্যবস্থাপনা রোধে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, মোংলা বন্দর একটি আন্তর্জাতিক মানের সমুদ্র বন্দর। অথচ এই বন্দর ও শিল্প এলাকার হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন একটি নদী পার হতে গিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট পান। জনগণের এই ভোগান্তি আর সহ্য করা হবে না। আমরা স্থায়ী সমাধান হিসেবে নদীর ওপর একটি আধুনিক সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছি, তবে তার আগ পর্যন্ত ফেরি ও পল্টুন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা হবে।
প্রশাসনের এমন তড়িৎ ও সমন্বিত উদ্যোগে মোংলার সাধারণ মানুষ এবং বন্দর সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে স্বন্তি ফিরে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অবসানে এই সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছেন।
এলাকাবাসী জানায়, পরিশেষে, মোংলা নদী পারাপারে দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি কেবল যাতায়াতের সমস্যা নয়, বরং এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার সাথেও জড়িত। প্রশাসনের এই জরুরি উদ্যোগ এবং সাত সদস্যের কমিটি গঠন মোংলার সাধারণ মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে। তবে অতীতেও এমন অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের অভাবে তা ঝিমিয়ে পড়ার নজির রয়েছে। তাই সাধারণ যাত্রীদের দাবি, সাত সদস্যের এই কমিটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত মাঠপর্যায়ে কাজের মাধ্যমে ভোগান্তি দূর করে। জনস্বার্থে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের সফল বাস্তবায়নই হবে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয়, কমিটির প্রস্তাবনা অনুযায়ী আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পল্টুন স্থাপনসহ অন্যান্য উন্নয়ন কাজ কতটুকু আলোর মুখ দেখে। মোংলার হাজারো শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখন প্রশাসনের এই প্রতিশ্রুতির দিকে। এটির বাস্তবায়ন চায় স্থানীয়রা।
মন্তব্য করুন