পাসওয়ার্ড জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের কোটি কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। অভিযোগ রয়েছে, এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার না হলেও সেগুলো সচল ও রোগীদের চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বকেয়া বিল উত্তোলনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে তদবিরও চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত কুড়িগ্রাম জেলার মানুষের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়। তবে প্রায় ছয় থেকে সাত বছর ধরে কোটি কোটি টাকা মূল্যের অনেক ভারী চিকিৎসা সরঞ্জাম অবহেলা ও অযত্নে বিভিন্ন কক্ষে পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব যন্ত্রপাতিতে ধুলোর আস্তরণ জমেছে।
অব্যবহৃত সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে অপারেশন থিয়েটারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, ইটিটি ও ইকো মেশিন, পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন, এন্ডোস্কপি মেশিন, ডায়াথার্মি মেশিন, ইনফিউশন পাম্প, সিরিঞ্জ পাম্প, ডিফিব্রিলেটর, পালস অক্সিমিটার, মেজর অর্থোপেডিক সেট, আর্থ্রোস্কোপ এবং ডপলার হার্ট ডিটেক্টর। কোটি কোটি টাকা মূল্যের এসব যন্ত্রপাতি পাসওয়ার্ড জটিলতার কারণে চালু করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এবং তাদের চিকিৎসাভোগান্তিও কমছে না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির আওতায় ৩২ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে ১৯৩টি চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ পায় মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্স ও হারামান এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সরবরাহ করা কিছু যন্ত্রপাতি চাহিদা অনুযায়ী হাসপাতালের পুরোনো ভবনে এবং বাকি সরঞ্জাম নতুন আটতলা ভবনের অব্যবহৃত ওটি কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন কক্ষে স্থাপন করা হয়। ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ সার্ভে কমিটি এসব সরঞ্জামের মান ও সঠিকতা যাচাই করে গ্রহণ করে।
পরে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির হাসপাতাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট অপারেশন প্ল্যান থেকে ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখান থেকে ১৭২টি চিকিৎসা সরঞ্জামের বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১১ কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব চিকিৎসা সরঞ্জামের অনেকগুলো আজ পর্যন্ত রোগীদের সেবায় ব্যবহার করা হয়নি। তা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের ১২ জুন তৎকালীন হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডা. শহিদুল্লাহ যন্ত্রপাতিগুলো সচল এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে উল্লেখ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বাকি বিল পরিশোধের সুপারিশ করেন।
বিল পরিশোধের সুপারিশের পর ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তিন সদস্যের একটি পরিদর্শন কমিটি গঠন করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও ওই পরিদর্শন কমিটির প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে অর্ধযুগ ধরে মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকলেও উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার সাধারণ মানুষ।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির উদ্দেশ্যে বিশেষ কৌশলে এসব চিকিৎসা সরঞ্জামের দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। এ ছাড়া তৎকালীন বাজারমূল্যের তুলনায় যন্ত্রপাতির ক্রয়মূল্য বেশি দেখিয়ে সেগুলো কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং কুড়িগ্রাম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত তদবির চলছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
হাসপাতালে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির মধ্যে এসি ও ফ্রিজসহ কিছু সরঞ্জাম চালু থাকলেও ইকো, ইটিটি ও পোর্টেবল এক্স-রে মেশিনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র স্থাপনের পর থেকে আর চালু করা হয়নি। কীভাবে এসব যন্ত্র সচল দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে, সে বিষয়ে তারা কিছু জানেন না বলেও দাবি করেন।
তাদের অভিযোগ, সাবেক ও বর্তমান কিছু কর্মকর্তা উৎকোচের বিনিময়ে বিল পরিশোধে ভূমিকা রেখেছেন এবং বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য এখনো তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আরও জানান, বেসরকারি হাসপাতালে একটি ইকো পরীক্ষা করাতে সাধারণত এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা এবং ইটিটি পরীক্ষায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে উন্নতমানের এসব পরীক্ষা করাতে ইকোর জন্য ২০০ টাকা এবং ইটিটির জন্য ৮০০ টাকা ব্যয় হওয়ার কথা।
তাদের ধারণা, সাবেক কিছু কর্মকর্তার নিজস্ব বা অংশীদারত্বভিত্তিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক থাকায় সরকারি হাসপাতালের এসব যন্ত্র চালু করা হয়নি। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূরে নেওয়াজ আহমেদ বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বকেয়া বিল না পাওয়ায় প্রয়োজনীয় পাসওয়ার্ড দিচ্ছে না। সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে জেলার সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত অব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন