পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিয়ালকাঠী পশুর হাটে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো খাজনা আদায় করা হয় না। ফলে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এ হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে বিরাজ করছে স্বস্তি ও আনন্দঘন পরিবেশ। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও পরিচিত এই পশুর হাটটি এখন কোরবানির পশু কেনাবেচায় ব্যস্ত সময় পার করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিয়ালকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই হাটটি কখনোই সরকারি ইজারার আওতায় আনা হয়নি। নেই কোনো ইজারাদার বা আনুষ্ঠানিক পরিচালনা কমিটি। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় এবং প্রশাসনের নজরদারিতে হাটটি পরিচালিত হয়ে আসছে। খাজনামুক্ত এই ব্যবস্থা হাটটিকে দেশের অন্যান্য পশুর হাট থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য এনে দিয়েছে।
হাটে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যাপারীরা গরু, বলদ, গাভী ও বাছুর নিয়ে আসছেন। যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা এখানে পশু বিক্রি করছেন। শুধু নির্ধারিত স্থানেই নয়, হাটসংলগ্ন সড়কের প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়েও পশু বেচাকেনা চলছে। ঈদকে ঘিরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যাপক উপস্থিতিতে পুরো এলাকা এখন জমজমাট।
স্থানীয়দের মতে, দেশের অধিকাংশ পশুর হাটে প্রতি লাখ টাকার গরু বিক্রিতে এক থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত খাজনা দিতে হয়। কিন্তু শিয়ালকাঠী হাটে কোনো ধরনের খাজনা না থাকায় ব্যবসায়ীরা বাড়তি খরচ থেকে মুক্ত থাকেন। এতে বিক্রেতারা যেমন বেশি লাভবান হন, তেমনি ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে পশু কিনতে পারেন।
যশোরের কেশবপুর থেকে আসা গরু বিক্রেতা সোহরাব হোসেন বলেন, “অন্যান্য হাটে খাজনা দিতে হয়, কিন্তু এখানে কোনো খরচ নেই। ফলে আমরা বেশি লাভে পশু বিক্রি করতে পারি।”
ক্রেতা মো. মনির সিকদার বলেন, “খাজনা না থাকায় দাম তুলনামূলক কম থাকে। তাই প্রতি বছরই আমি এখান থেকেই কোরবানির পশু কিনি।”
স্থানীয় খামারি জামাল হাওলাদার জানান, গরুর খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ বছর পশুর দাম কিছুটা বেশি হলেও খাজনা না থাকায় তারা কিছুটা স্বস্তিতে আছেন। আরেক খামারি শাহ আলম হাওলাদার বলেন, “খাজনা না থাকায় আমাদের লাভ থাকে বেশি, অন্য হাটে সেই সুযোগ কমে যায়।”
হাটের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি জাল টাকা শনাক্তে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ফলে বড় অঙ্কের লেনদেন নিরাপদে সম্পন্ন হচ্ছে।
শিয়ালকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কে এম সেলিম জানান, হাট থেকে পাওয়া স্বেচ্ছা অনুদান বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের ব্যয় নির্বাহে ব্যবহৃত হয়।
ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, শিয়ালকাঠী পশুর হাট একটি ঐতিহ্যবাহী হাট। এখানে কোনো খাজনা আদায় করা হয় না, ফলে ক্রেতা-বিক্রেতারা স্বস্তিতে বেচাকেনা করতে পারেন। প্রশাসন নিয়মিতভাবে হাটের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
স্থানীয়দের মতে, খাজনামুক্ত এই শতবর্ষী হাটটি দেশের পশু বাণিজ্যে একটি অনন্য উদাহরণ। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এই ঐতিহ্যবাহী হাটে বাড়ছে পশুর সমাগম ও বেচাকেনার গতি।
মন্তব্য করুন