পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় খাল-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে ভয়াবহ পানি সংকট, জলাবদ্ধতা ও কৃষি বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, খাল দখল, অপরিকল্পিত কালভার্ট ও স্লুইসগেট নির্মাণ, কচুরিপানা এবং ময়লা-আবর্জনায় উপজেলার অধিকাংশ খাল এখন মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। এতে শুধু পরিবেশ নয়, পুরো এলাকার কৃষি ও জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে খাল পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন, আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
একসময়কার প্রাণচঞ্চল খালগুলো এখন কার্যত পানিশূন্য ও চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়েছে। মঠবাড়িয়া বন্দরের খাল, বহেরাতলা-দক্ষিণ বন্দর খাল, মঠবাড়িয়া-মিরুখালী খাল, বহেরাতলা-আলগি পাতাকাটা-ভাঙাপোল খাল, মিরুখালী-সাফা খাল, মঠবাড়িয়া-মাছুয়া খাল, মঠবাড়িয়া-তুষখালী খাল এবং থানাপাড়া-সূর্য্যমনি খালসহ একাধিক খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব খাল একসময় কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌ-যোগাযোগ ও জীববৈচিত্র্যের প্রধান উৎস ছিল, সেগুলো এখন কচুরিপানা ও ময়লার স্তূপে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খাল পুনঃখনন ও পানি প্রবাহ সচল করার পরিবর্তে বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে খালের দুই পাশ ভরাট করে মাঝখানে সংকীর্ণ পথ রাখা হয়েছে। আবার মাঝ বরাবর পিলার বসানোয় সেখানে কচুরিপানা ও আবর্জনা আটকে পানি চলাচল পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে। এতে নৌকা চলাচলও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশেষ করে বিশখালী ও বলেশ্বর নদীর সংযোগস্থল হিসেবে পরিচিত মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা গ্রামের “দোগনা” ও “ভূতা” খাল এলাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল খালের মধ্যে থাকা অবৈধ বাঁধ অপসারণ করে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে একাধিক সংকীর্ণ কালভার্ট নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশনের সংকট আরও বেড়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, “এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।”
বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ঘরবাড়ি, রাস্তা ও কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে তীব্র পানি সংকট। ফলে দুই মৌসুমেই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার হাজার একর জমিতে আগের মতো ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। পানি সংকট ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে। একসময় যেসব জমিতে ধান, শাকসবজি, নারকেল, সুপারি ও বিভিন্ন ফলের বাম্পার ফলন হতো, এখন সেখানে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে এলাকার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিও হুমকির মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুন নেসা সুমি বলেন, “অপরিকল্পিত বাঁধ ও কালভার্ট নির্মাণের কারণে কৃষিকাজে নানা ধরনের সমস্যা হচ্ছে। এগুলো অপসারণ প্রয়োজন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করা হলে সমস্যা সমাধান সহজ হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, টেকসই ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ছাড়া মঠবাড়িয়ার খালগুলো রক্ষা করা সম্ভব নয়। দ্রুত খাল পুনঃখনন, অবৈধ দখল ও বাঁধ অপসারণ, অপরিকল্পিত কালভার্ট পুনর্বিন্যাস এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর মতে, শুধু কাগুজে প্রকল্প নয়, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমেই মঠবাড়িয়ার মৃতপ্রায় খালগুলোকে আবার জীবন্ত করে তুলতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এই জনপদ আরও ভয়াবহ পরিবেশ ও কৃষি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।
মন্তব্য করুন