পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে প্রশাসনিক অস্থিরতা। উপজেলার ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থায়ী প্রধান না থাকায় ভারপ্রাপ্তদের ওপর নির্ভর করেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ কার্যত শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমেও দেখা দিয়েছে জটিলতা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, মঠবাড়িয়ায় বর্তমানে ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৭টি মাদ্রাসা এবং ৩টি কলেজসহ মোট ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারপ্রাপ্ত প্রধানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ উপজেলায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১৩টি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় স্থায়ী প্রধান না থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধানরা দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রশাসনিক বিষয় নিষ্পত্তি এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। ফলে শিক্ষার গুণগত মান রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
শুধু প্রতিষ্ঠানপ্রধান সংকটই নয়, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ নিয়েও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ভান্ডারিয়া উপজেলার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে মঠবাড়িয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পরে ২০২৬ সালের ১২ জুলাই তাকে মঠবাড়িয়ার স্থায়ী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হলেও ১৫ জুলাই পর্যন্ত তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি। শিক্ষা অফিস সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে তিনি যোগদান করতে পারেন।
এদিকে উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. নজরুল ইসলাম সীমিত জনবল নিয়েও শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র গ্রহণ ও বিতরণ, নকলমুক্ত পরীক্ষা পরিচালনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আয়োজনসহ নানা দায়িত্ব তার ওপর বর্তেছে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক কার্যক্রম সচল থাকলেও একজন কর্মকর্তার পক্ষে পুরো ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
গুলিশাখালী জি.কে. ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক নূর হোসেন মোল্লা বলেন, দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলে প্রশাসনিক ও একাডেমিক উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা সৃষ্টি হয়। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক নেতৃত্বে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। শিক্ষার স্বার্থে দ্রুত নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষ থেকে শিক্ষক দেওয়া হবে।” তবে শিক্ষা প্রশাসনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি। পরে অসুস্থতার কথা জানিয়ে আলাপ শেষ করেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন প্রধানের পদ শূন্য থাকা শিক্ষার মান, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী শিক্ষা প্রশাসনের অভাব সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়ন, তদারকি এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে।
স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত শূন্য পদে যোগ্য প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, নিয়মিত পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় দীর্ঘদিনের এ সংকট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা তাদের।
মন্তব্য করুন