আল্লাহর শেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য একজন মুমিনের ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা শুধু ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহতে এর বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলতের কথাও বর্ণিত হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীর ওপর রহমত নাজিল করেন এবং ফেরেশতারা তাঁর জন্য রহমতের দোয়া করেন। সুতরাং হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ কর এবং অধিক পরিমাণে সালাম পাঠাও।’ (সূরা আহযাব, আয়াত: ৫৬)
এই আয়াত থেকে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। হাদিসে দরুদ পাঠের বিভিন্ন ফজিলতও বর্ণিত হয়েছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, ১/১৬৬; জামে তিরমিজি, ১/১০১)
অন্য এক হাদিসে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তাঁর ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করবেন, তার দশটি গুনাহ ক্ষমা করবেন এবং তার মর্যাদা দশ ধাপ বৃদ্ধি করবেন। (সুনানে নাসায়ি, ১/১৪৫; মুসনাদে আহমদ, ৩/১০২)
দরুদ পাঠের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত হলো, দরুদ পাঠকারীর জন্য ফেরেশতারা দোয়া করতে থাকেন। হযরত আমের ইবনে রবিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যতক্ষণ তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করতে থাকে, ততক্ষণ ফেরেশতারাও তার জন্য দোয়া করতে থাকেন। (মুসনাদে আহমদ, ৩/৪৪৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৯০৭)
দরুদ পাঠের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফাআত লাভেরও সুসংবাদ হাদিসে এসেছে। হযরত রুওয়াইফি ইবনে সাবিত আল-আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একটি দরুদের কথা বলেছেন, যা পাঠকারীর জন্য তাঁর সুপারিশের কারণ হবে। (আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি, ৫/৪৪৮১)
এ ছাড়া হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন তাঁর সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে। (জামে তিরমিজি, ১/১১০)
দরুদ পাঠের সঙ্গে দোয়ারও বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। হযরত উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি তাঁর দোয়ার কতটুকু অংশ দরুদের জন্য নির্ধারণ করবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে নিজের ইচ্ছামতো করার কথা বলেন এবং বেশি করলে তা আরও উত্তম বলে জানান। একপর্যায়ে উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন তাঁর পুরো দোয়ার সময় দরুদের জন্য নির্ধারণ করার কথা বলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তাহলে তাঁর উদ্দেশ্য পূরণ হবে এবং গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (জামে তিরমিজি, ২/৭২)
দরুদ ও সালামের মাধ্যমে উম্মতের পক্ষ থেকে প্রেরিত সালামও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, পৃথিবীতে বিচরণকারী কিছু ফেরেশতা রয়েছেন, যারা তাঁর কাছে তাঁর উম্মতের সালাম পৌঁছে দেন। (মুসনাদে আহমদ, ১/৪৪১; সুনানে নাসায়ি, ১/১৪৩)
দরুদ পাঠের মাধ্যমে দোয়ার আদবও পূর্ণ হয়। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি বর্ণনায় এসেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ না করা পর্যন্ত দোয়া আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকে। (জামে তিরমিজি, ১/১১০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও সতর্ক করেছেন, কোনো সম্প্রদায় এমন বৈঠকে বসে যেখানে তারা আল্লাহকে স্মরণ করে না এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরুদ পাঠ করে না, সেই বৈঠক কিয়ামতের দিন তাদের জন্য আফসোসের কারণ হতে পারে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৯৯৬৬; আল-মুস্তাদরাক, ১/৫৫০)
তাই একজন মুমিনের উচিত নিয়মিত দরুদ শরীফ পাঠ করা এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানো। শুধু মুখে দরুদ পাঠ নয়, তাঁর দেখানো পথে জীবন পরিচালনার চেষ্টাও থাকতে হবে। দরুদ এমন একটি সহজ আমল, যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত, গুনাহ মাফ এবং আখিরাতের কল্যাণের আশা করা যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম পাঠ করার এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট
সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট
সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট
সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট
মন্তব্য করুন