নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডহীন মানুষ যেমন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষাবিহীন কোনো জাতিও পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। মানুষের মধ্যে আল্লাহপ্রদত্ত যেসব গুণাবলি ও প্রতিভা সুপ্ত রয়েছে, শিক্ষার মাধ্যমেই সেগুলোর বিকাশ ঘটে। পবিত্র কোরআনের প্রথম নির্দেশই হলো—‘পড়ো’। মানবজাতির প্রতি এটিই ছিল আল্লাহ তাআলার প্রথম নির্দেশ।
শিক্ষার আলো ছড়িয়ে মানবসভ্যতাকে আলোকিত করার ক্ষেত্রে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অবদান অনন্য। মাত্র ২৩ বছরের নবুয়তি জীবনে তিনি এমন এক সমাজব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেন, যেখানে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও হিংসার পরিবর্তে জ্ঞান, ন্যায়, মানবিকতা ও শান্তির চর্চা প্রতিষ্ঠিত হয়।
মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা বিস্তারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের প্রতি দয়া, কল্যাণকামিতা ও বিনম্র আচরণ। তিনি মানুষকে যে কাজের শিক্ষা দিতেন, নিজে সর্বপ্রথম সেই কাজের ওপর আমল করতেন। ফলে তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। এ কারণেই তাঁর শিক্ষা মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-এর কোমল হৃদয় ও বিনম্র স্বভাবের প্রশংসা করে বলেন, ‘আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয়ের অধিকারী হয়েছেন। আর আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯)
শিক্ষক ও শিক্ষা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। শিক্ষকের মাধ্যমেই জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। মহান আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাঁর প্রিয় রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে প্রস্তুত করেন। নবী (সা.) কোনো প্রচলিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করেননি; তাঁর জ্ঞান ছিল ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি নিজ প্রবৃত্তি থেকে কোনো কথা বলেন না। তা তো কেবল ওহি, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়।’ (সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩-৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।’ তাঁর শিক্ষা ছিল সহজ, বাস্তবভিত্তিক ও মানবিক। তিনি শুধু জ্ঞান বিতরণ করেননি; বরং সেই জ্ঞানকে মানুষের জীবন ও চরিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন।
মহানবী (সা.)-এর আগমনের আগে আরব সমাজে অজ্ঞতা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল। লেখাপড়ার প্রচলনও ছিল সীমিত। কিন্তু তাঁর আগমনের পর সেই সমাজেই জ্ঞানচর্চার ব্যাপক প্রসার ঘটে। বিভিন্ন গোত্রের লোকজন তাঁর কাছে এসে ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। পরে তারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে অন্যদের শিক্ষা দিতেন।
মদিনায় প্রতিষ্ঠিত ‘সুফ্ফা’ ছিল মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা বিস্তারের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মসজিদে নববীর একটি অংশে সাহাবায়ে কেরাম জ্ঞানচর্চা করতেন। অনেক সাহাবি সেখানে অবস্থান করে দিন-রাত জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকতেন। মহানবী (সা.) নিজে এই শিক্ষাকেন্দ্রের কার্যক্রমের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় বদরের যুদ্ধের পর। যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে যারা শিক্ষিত ছিলেন, তাদের মধ্যে অনেককে নিরক্ষর মুসলমানদের শিক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে মুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট হয়, মহানবী (সা.) জ্ঞান ও শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তিনি শিক্ষাকে শুধু ধর্মীয় জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশকেও শিক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর শিক্ষা গ্রহণ করে সাহাবায়ে কেরাম তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতেন এবং অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতেন।
রাসুল (সা.)-এর যুগে কোরআন লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণের কাজও গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে হাদিস সংরক্ষণ ও লিখিতভাবে প্রচারেরও বিস্তৃতি ঘটে। এভাবে জ্ঞানকে সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়।
মহানবী (সা.)-এর শিক্ষাদর্শের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি মানুষকে শুধু কথা দিয়ে শিক্ষা দেননি; বরং নিজের জীবন দিয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর আচার-আচরণ, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, সত্যবাদিতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাই ছিল জীবন্ত শিক্ষার এক অনন্য উদাহরণ।
প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আরবের মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে মহানবী (সা.) জ্ঞান ও শিক্ষাকে মানবমুক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করেই অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান, বিভেদ থেকে ঐক্য এবং অন্যায় থেকে ন্যায় ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
তাই বিশ্ব মানবতার শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক হিসেবে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষাদর্শ আজও সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুকরণীয়। বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, হিংসা, বিভেদ ও অস্থিরতা দূর করতে তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ ও শিক্ষাকে বুঝে তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট। সাবেক ইমাম ও খতীব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট। সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট। সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।
মন্তব্য করুন