
দশ বছর ধরে অল্প অল্প করে জমানো প্রায় দুই লাখ টাকা। স্বামী-স্ত্রীর কষ্টের উপার্জন থেকে সংসারের খরচ মিটিয়ে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়েছিলেন এই অর্থ। নিরাপদ মনে করে টাকাগুলো রাখা হয়েছিল একটি জর্দার কৌটায়।
কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই কৌটা খুলে মনোয়ারা বেগম দেখলেন, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় নষ্ট হয়ে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। স্বামীকে হারানোর পর জীবিকার পথও সংকুচিত হয়ে পড়া এই বিধবা এখন শেষ সম্বল হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন।
মনোয়ারা বেগম শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোডসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ভোগাই নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। তাঁর স্বামী জিয়া উদ্দীন ছিলেন মিষ্টি তৈরির কারিগর।
দুজনের কষ্টের উপার্জনেই চলত সংসার। সেই আয় থেকে অনেক কষ্টে দুই মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন তারা। সংসারের প্রয়োজন মেটানোর পর ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রায় ১০ বছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমাতেন মনোয়ারা ও জিয়া উদ্দীন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, খুচরা টাকা জমিয়ে পরে এক হাজার টাকার নোট সংগ্রহ করতেন তারা। এভাবে ধীরে ধীরে সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়তে থাকে। প্রায় আট মাস আগে তাঁদের সঞ্চয় দাঁড়ায় দুই লাখ টাকায়। পরে টাকাগুলো একটি জর্দার কৌটায় রেখে দেন মনোয়ারা।
এরপর প্রায় তিন মাস আগে মারা যান তাঁর স্বামী জিয়া উদ্দীন। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই একা সামলাতে হচ্ছে মনোয়ারাকে।
এর মধ্যে ভোগাই নদী থেকেও আগের মতো বালু-পাথর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নদী থেকে বালু-পাথর সংগ্রহ করে যে আয় করতেন, সেই পথও অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে।
সম্প্রতি টাকার প্রয়োজন হলে জর্দার কৌটাটি বের করেন মনোয়ারা। কিন্তু কৌটার মুখ খুলতে না পারায় পরে সেটি কেটে ভেতরের টাকা বের করেন। তখনই দেখতে পান, দীর্ঘদিন কৌটায় রাখা টাকাগুলো ঝাঁঝরা হয়ে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। ব্যবহার করার মতো অবস্থায় নেই সঞ্চয়ের সেই অর্থ।
রোববার নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা রোডসংলগ্ন এলাকায় মনোয়ারা বেগমের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় হারানোর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এই টাকাডা আছিল আমার শেষ সম্বল। স্বামী নাই, কামকাজও নাই। মেয়েগো বিয়া দিছি অনেক কষ্টে। দশ বছর ধরে একটু একটু কইরা টাকা জমাইছি। ভাবছিলাম, বিপদের সময় এই টাকাডা কাজে লাগামু। অহন সব শেষ হইয়া গেল। অহন আমি কী করমু?’
তিনি আরও বলেন, ‘ভোগাই নদী থাইকা আগে বালু-পাথর তুইলা বিক্রি কইরা সংসার চালাইতাম। অহন নদীতে পাথরও নাই। স্বামীও নাই। শেষ সম্বলটাও নষ্ট হইয়া গেল। আল্লাহ আমার আর কী রাখছে, জানি না।’
স্থানীয় বাসিন্দা মিলন শেখ বলেন, ‘মনোয়ারা ও তাঁর স্বামী জিয়া দুজনই খুব কষ্ট করে সংসার চালাইতেন। জিয়ার মৃত্যুর পর অভাবের সংসারে টাকা নষ্ট হওয়ার কথা শুনে সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছি। তাঁদের বাসায়ও গিয়েছিলাম। মনোয়ারা এখন শুধু কাঁদেন।’
প্রতিবেশী সাদ আল জুনায়েদ বলেন, দীর্ঘদিন কষ্ট করে সঞ্চয় করা এই টাকা মনোয়ারা বেগমের কাছে শুধু অর্থ ছিল না; স্বামীর মৃত্যুর পর সেটিই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। সেই সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
মন্তব্য করুন