
বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে ভুলবশত অ্যানেস্থেসিয়া ইনজেকশন প্রয়োগের ঘটনায় মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। রোববার (১৫ মার্চ) সকালে হাসপাতালের নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগের চতুর্থ তলার ওয়ার্ডে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর হাসপাতালজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং বিষয়টি ঘিরে রোগীর স্বজনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত দুই নারী হলেন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর এলাকার শেফালী বেগম (৬০) এবং বরিশাল নগরের কাশিপুর এলাকার হেলেনা বেগম (৪৮)। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গালের টিউমারজনিত সমস্যায় শেফালী বেগম গত ২২ ফেব্রুয়ারি শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি হন। অন্যদিকে হেলেনা বেগম গলায় থাইরয়েড সমস্যার কারণে এক সপ্তাহ আগে একই বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। রোববার সকালে তাদের দুজনেরই অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, সকাল প্রায় ৭টার দিকে ইএনটি বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স মলিনা রানী হাওলাদার অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেওয়ার কথা থাকলেও ভুলবশত অ্যানেস্থেসিয়া ইনজেকশন শিরায় পুশ করেন। প্রথমে হেলেনা বেগমের শরীরে ইনজেকশন প্রয়োগ করা হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মারা যান।
স্বজনদের দাবি, প্রথম ঘটনার পরও পরিস্থিতি না বুঝে একই নার্স পাশের বেডে থাকা শেফালী বেগমের শরীরেও একই ধরনের অ্যানেস্থেসিয়া ইনজেকশন পুশ করেন। ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই তার অবস্থাও দ্রুত খারাপ হয়ে যায় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনিও মারা যান। মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে একই ওয়ার্ডে দুই রোগীর মৃত্যুতে স্বজনরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং ঘটনাটিকে চিকিৎসায় চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার ফল বলে অভিযোগ করেন।
এ সময় নিহতদের স্বজনরা দাবি করেন, ঘটনার পর ওয়ার্ডের কিছু নার্স বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে হাসপাতালজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযুক্ত সিনিয়র স্টাফ নার্স মলিনা রানী হাওলাদার নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, সারারাত ডিউটি করার পর সকালে কীভাবে এমন ভুল হয়ে গেল তা তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন না। এটি অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। প্রাথমিকভাবে দায়িত্বে থাকা নার্সদের অবহেলার বিষয়টি সামনে এসেছে। এটি অপেশাদারিত্বের শামিল এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ঘটনার তদন্তে ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি জানান, হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আমিনুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, নিহতদের পরিবার চাইলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। এদিকে হঠাৎ এমন ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তারা চিকিৎসক ও নার্সদের দায়িত্বে অবহেলা ও খামখেয়ালিপনার কারণেই এই মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মন্তব্য করুন