ঢাকার সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ নেয়ামত উল্লাহকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যে সর্বশেষ চাঁদাবাজির মামলা হওয়ার পর সোমবার (১৭ আগস্ট) রাতে তাকে ঢাকা জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। পুলিশের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীনের নির্দেশে নেয়ামত উল্লাহকে সাভার মডেল থানা থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর আগে তাকে একটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
নেয়ামত উল্লাহর বিরুদ্ধে সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ, প্রভাব খাটানোর চেষ্টা, আসামি ও তাদের স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ দাবি এবং বিভিন্ন মামলায় হয়রানির ভয় দেখানোর মতো অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন।
গত ১৬ আগস্ট ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেয়ামত উল্লাহসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেন সাভারের বাসিন্দা সুরাইয়া বেগম। মামলায় নেয়ামত উল্লাহকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ফেন্সি সামির ও সাদ্দাম হোসেনসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজন।
বাদীর জবানবন্দি গ্রহণের পর আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, সুরাইয়া বেগমের ছেলে শামীম রেজার কাছে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন আসামিরা। গত ২২ মে কয়েকজন শামীমের রিকশার গ্যারেজে গিয়ে ৩৮ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গ্যারেজে ভাঙচুর চালিয়ে ক্ষয়ক্ষতি এবং নগদ টাকা ও একটি মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, একটি মামলায় শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারের পর সাভার মডেল থানায় নেওয়া হয়। সেখানে এসআই নেয়ামত উল্লাহ তাকে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ভয় দেখান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ সময় শামীম ও তার স্ত্রীকে বিভিন্ন মামলা, গ্রেপ্তার ও পরোয়ানা-সংক্রান্ত হয়রানি থেকে রক্ষা করার কথা বলে ২০ লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে দুই দফায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেওয়া হয় বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া শামীমের কাছ থেকে নগদ ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, একটি স্বর্ণের আংটি এবং প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের তিনটি মোবাইল ফোন নেওয়ার অভিযোগও মামলায় করা হয়েছে। পরে তিনটি মোবাইল ফোন ফেরত দেওয়া হলেও নগদ টাকা ও আংটি ফেরত দেওয়া হয়নি বলে বাদী অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার না করার আশ্বাস দিয়ে শামীমের পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতের নির্দেশে পিবিআইয়ের তদন্তে যাচাই হবে।
শামীম রেজার পরিবারের অভিযোগ, তাকে গ্রেপ্তারের পর সাভারের পশ্চিম রাজাশন এলাকার তার রিকশার গ্যারেজে একাধিকবার হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ২৩টি অটোরিকশা ও বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি লুটের অভিযোগও আগে উঠেছিল। এ নিয়ে থানায় অভিযোগ করা হলেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছিলেন এসআই নেয়ামত উল্লাহ। এর আগে গণমাধ্যমের কাছে তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
নেয়ামত উল্লাহর বিরুদ্ধে সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে চাকরি হারানোর ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা কিছু অডিও রেকর্ড নিয়ে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন ঘটনায় তিনি থানার অন্য পুলিশ সদস্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন। তবে এসব অডিওর সত্যতা ও অভিযোগের সার্বিক বিষয়ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সর্বশেষ চাঁদাবাজির মামলায় পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পরদিনই নেয়ামত উল্লাহকে সাভার মডেল থানা থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্তের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার ফলে আপাতত সাভার মডেল থানায় তার মাঠপর্যায়ের দায়িত্বের অবসান হয়েছে। এখন আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পিবিআইয়ের তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে; আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
মন্তব্য করুন