১৯৬৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বরিশাল বিভাগের বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার শান্ত-সবুজে ঘেরা গ্রাম গ্রেদলক্ষীপুরায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আ.খ.ম. আবু বকর সিদ্দীক। তাঁর পূর্ণ নাম আবুল খায়ের মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দীক। পিতা মরহুম মাওলানা আব্দুল গনি এবং মাতা মরহুমা মরিয়ম খানমের স্নেহ ও আদরে বেড়ে ওঠেন তিনি।
শৈশবে হয়তো তাঁর চোখে ধরা পড়েনি ভবিষ্যতের বিশাল কর্মপরিসর। তবে তাঁর ভেতরে নিঃশব্দে বেড়ে উঠছিল জ্ঞানসাধনা, শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। সময়ের পরিক্রমায় সেই সম্ভাবনার বীজই রূপ নেয় এক শিক্ষা-সাধকের দীর্ঘ ও অনুপ্রেরণাময় পথচলায়।
১৯৯৩ সালে তিনি ফয়রা দরবারের প্রসিদ্ধ পীর আলহাজ মাওলানা আব্দুল কুদ্দুসের দ্বিতীয় কন্যার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ বন্ধন শুধু দুটি পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করেনি; তাঁর জীবনে যুক্ত করেছে একটি গভীর আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতাও।
তাঁদের দাম্পত্য জীবন আলোকিত হয়েছে দুই পুত্রসন্তান—তানভীর আহমদ ও তাওকীর আহমদের আগমনে। তাঁরা বর্তমানে পিতার প্রতিষ্ঠিত দারুননাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদরাসায় ইলম অর্জনে নিয়োজিত। যেন পিতার শিক্ষা-স্বপ্নের ধারাবাহিকতা নতুন প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে।
আ.খ.ম. আবু বকর সিদ্দীকের শিক্ষাজীবনের শুরু নিজ গ্রামের গ্রেদলক্ষীপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি রহমতপুর আলিম মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে এক বছর অধ্যয়ন শেষে সপ্তম শ্রেণিতে উত্তর তালগাছিয়া ফাযিল মাদরাসায় ভর্তি হন।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষা শেষ হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশের প্রথম কামিল মাদরাসা, আল্লামা শাহ নেছারউদ্দীন আহমদ প্রতিষ্ঠিত ছারছিনা দারুসসুন্নাত কামিল মাদরাসায়।
ইলমে দ্বীনের এ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রে অধ্যয়ন করে তিনি ১৯৮৩ সালে দাখিল, ১৯৮৫ সালে আলিম এবং ১৯৮৭ সালে ফাযিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ১৯৮৯ সালে তিনি কামিল হাদিস পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ অর্জন করেন।
তবে জ্ঞান অর্জনের পথ সেখানেই থেমে থাকেনি। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। সেখান থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
ঐতিহ্যবাহী মাদরাসাশিক্ষার গভীরতা এবং আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার বিস্তৃতি তাঁর ব্যক্তিত্বকে এক অনন্য সমন্বিত রূপ দেয়। পরবর্তী সময়ে এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাই তাঁকে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে তিনি বহু বরেণ্য আলেম ও শিক্ষাবিদের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—আল্লামা নিয়ায মাখদুম খোতানী, শরীফ মুহাম্মাদ আব্দুল কাদের, মাওলানা আব্দুর রব খান, মুফতি আ.ম.ম. আহমাদুল্লাহ, মুফতি মুহা. মুস্তফা হামীদি, মাওলানা মুহা. আমজাদ হোসাইন, মাওলানা মুহাম্মাদ রেদওয়ানুল করীম, ছুফি মাওলানা আব্দুর রশিদ, মাওলানা রুহুল আমিন ফরায়েজি, মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল কাদের, মাওলানা ড. কাফিলুদ্দীন সরকার ছালেহী, ড. আ. র. ম. আলী হায়দার মুর্শেদী, অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল মালেক, অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক ড. মো. আনসার উদ্দীন এবং ড. আ.ন.ম. রইস উদ্দীন।
আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও আত্মশুদ্ধির পথেও তিনি বাংলার হক দরবার ছারছিনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এ সম্পর্ক তাঁর জ্ঞানসাধনায় যুক্ত করে হৃদয়ের গভীরতা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির নতুন মাত্রা।
কামিল শিক্ষা সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই ১৯৯১ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি এক ঐতিহাসিক দায়িত্বে যুক্ত হন। ডেমরার শুকুরশী গোরস্থান সংলগ্ন বর্তমান দারুননাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদরাসার প্রধান হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
তবে প্রতিষ্ঠানটির শুরু ছিল অত্যন্ত বিনম্র। ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে পার্শ্ববর্তী হুসাইনিয়া জামে মসজিদের ইমাম আলহাজ মাওলভী নূরুল হক সাহেবের পরিচালিত একটি ছোট মক্তব সেখানে স্থানান্তর করা হয়। সেই মক্তব থেকেই শুরু হয় প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রম।
১৯৯০-৯১ সালে দুই বছর শুধু ইবতেদায়ি স্তরের কার্যক্রম চলতে থাকে। এ সময়ের মধ্যে তিনজন ইবতেদায়ি প্রধান পরিবর্তন হন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মাত্র ৭০০ টাকা বেতনে ইবতেদায়ি প্রধান হিসেবে দারুননাজাতের খেদমতে যোগ দেন আ.খ.ম. আবু বকর সিদ্দীক।
সেই দিনটি পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
আল্লাহর রহমতের ওপর অবিচল আস্থা রেখে ১৯৯২ সালে মাত্র ১১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে তিনি দাখিল স্তরের কার্যক্রম শুরু করেন। তখন দশম শ্রেণিতে একজন, নবম শ্রেণিতে একজন, অষ্টম শ্রেণিতে তিনজন এবং সপ্তম শ্রেণিতে ছয়জন শিক্ষার্থী ছিল।
সেই ক্ষুদ্র সূচনা থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
সর্বসাধারণের আস্থা, সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্টদের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি ধাপে ধাপে উন্নীত হয়। ১৯৯৪ সালে আলিম, ১৯৯৬ সালে ফাযিল এবং ২০০৪ সালে কামিল পর্যায়ের একাডেমিক অনুমতি ও মঞ্জুরি লাভ করে। একই সঙ্গে ফাযিল পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সরকারি অংশও অনুমোদিত হয়।
পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয় উচ্চশিক্ষার নতুন নতুন বিভাগ ও কোর্স। এর মধ্যে রয়েছে—
দারুননাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদরাসার পরিচয় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে এর একাডেমিক ফলাফলের ধারাবাহিকতায়।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি দাখিল, আলিম, ফাযিল ও কামিল পরীক্ষার ফলাফলে সমগ্র বাংলাদেশে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে আসছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এ সাফল্য কোনো সাময়িক অর্জন নয়; বরং এটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরে গড়ে ওঠা শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা, নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রমের ফল।
এ ধারাবাহিক কৃতিত্বের কারণে আজ দারুননাজাত সারা দেশে পরিচিত ও আলোচিত একটি নাম। ফলাফল প্রকাশের সময় দেশের মাদরাসাশিক্ষা অঙ্গনের দৃষ্টি থাকে প্রতিষ্ঠানটির দিকে।
দীর্ঘদিনের এ পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালে আরবি বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দারুননাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদরাসাকে ‘সেরা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক অধ্যক্ষ আ.খ.ম. আবু বকর সিদ্দীকের হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন। তিন দশকেরও বেশি সময়ের শ্রম, ত্যাগ ও প্রতিশ্রুতির স্বীকৃতির এ মুহূর্ত ছিল প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টদের জন্য আবেগঘন।
মাত্র ৭০০ টাকা বেতনের একজন ইবতেদায়ি প্রধান থেকে জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পৌঁছানোর এ যাত্রা শিক্ষা অঙ্গনের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প।
আজ দারুননাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদরাসা প্রায় ১২ হাজারের বেশি ইলমপিপাসু শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর। প্রতিষ্ঠানটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বপরিসরেও একটি সম্মানিত ইলমি মারকায হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
প্রশাসনিক ব্যস্ততার মাঝেও আ.খ.ম. আবু বকর সিদ্দীক নিজের হাতে দরস দেওয়ার অভ্যাস ছাড়েননি। তিনি এখনো নিয়মিত সহিহ বুখারি ও জামে তিরমিজির দরস প্রদান করেন। তাঁর কর্মজীবন যেন স্মরণ করিয়ে দেয়—একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনো শুধু প্রশাসক হয়ে ওঠেন না; তিনি আজীবন শিক্ষকই থেকে যান।
একজন শিক্ষকের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তাঁর শিক্ষার্থীদের অর্জনের মধ্য দিয়ে। এ মানদণ্ডে আ.খ.ম. আবু বকর সিদ্দীকের শিক্ষাজীবনের সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাঁর হাতে গড়ে ওঠা বহু শিক্ষার্থী আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত। অনেকে বৃত্তি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন।
মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ইরাকের কারবালা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাঁর শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন ও গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন।
তাঁদের কর্মপরিধি শুধু ইলমে দ্বীনের অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর শিক্ষার্থীরা আজ দাঈ, লেখক, গবেষক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশায় কর্মরত। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাঁরা রেখে চলেছেন সাফল্যের স্বাক্ষর।
ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক সম্পর্কে আ.খ.ম. আবু বকর সিদ্দীকের দৃষ্টিভঙ্গি গভীর ও মানবিক। তাঁর বিশ্বাস, ছাত্র ও শিক্ষকের সম্পর্ক আজীবনের। এ বন্ধন শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়াল কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী আত্মিক সম্পর্ক।
তাঁর শিক্ষা-দর্শনে ছাত্রের সাফল্যই শিক্ষকের প্রকৃত অর্জন। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন শিক্ষকের জীবন তখনই সার্থক হয়, যখন তাঁর শিক্ষার্থীরা তাঁকে অতিক্রম করে আরও দূরে ও আরও উঁচুতে পৌঁছাতে পারে।
শিক্ষা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি লেখালেখিতেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় পদচারণা।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে আল্লামা নিয়ায মাখদুম খোতানীর জীবনী এবং চার খণ্ডে প্রকাশিত ‘জীবনের পাথেয়’ সিরিজ—প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, তৃতীয় খণ্ড এবং চতুর্থ খণ্ড।
এসব গ্রন্থে তিনি তুলে ধরেছেন নিজের চিন্তা, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, শিক্ষা-দর্শন ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির নানা দিক।
একটি নিভৃত গ্রামের ছোট মক্তব থেকে শুরু হওয়া একটি যাত্রা আজ পৌঁছে গেছে বিশ্বদরবারের নানা প্রান্তে। আল-আজহারের প্রাচীন প্রাঙ্গণ থেকে মদিনার শিক্ষাঙ্গন, জাতীয় পর্যায়ের সম্মাননা মঞ্চ থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফলাফলের আলোচনায়—দারুননাজাতের পথচলা আজ বহুমাত্রিক।
এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি ধাপে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে আছেন একজন শিক্ষা-সাধক, যিনি বিশ্বাস করেন—একজন শিক্ষকের জীবন তখনই সার্থক হয়, যখন তাঁর প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীরা তাঁকে অতিক্রম করে আরও দূরে এগিয়ে যায়।
আ.খ.ম. আবু বকর সিদ্দীকের জীবন তাই শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্যের গল্প নয়; এটি শিক্ষা, নিষ্ঠা, ত্যাগ, দূরদর্শিতা ও প্রজন্ম গড়ে তোলার এক দীর্ঘ অনুপ্রেরণার ইতিহাস।
লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর
মন্তব্য করুন