জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
১৬ জুলাই ২০২৬, ৬:৪৯ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

দুনিয়া যখন আখিরাতের পুঁজি

দুনিয়ার প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। জীবিকার প্রয়োজন, পরিবারের দায়িত্ব, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা—এসবই মানুষকে সম্পদ অর্জনের পথে পরিচালিত করে। কিন্তু ইসলাম দুনিয়াকে কখনো মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেনি; বরং একে আখিরাতের শস্যক্ষেত্র হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তাই হালাল উপায়ে সম্পদ উপার্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তা ব্যয় করা নিছক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং তা ইবাদতেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিপরীতে, হারাম পথে সম্পদ অর্জন কিংবা সেই সম্পদকে পাপাচারের উপকরণে পরিণত করা মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনেরই বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

এই বাস্তবতাই গভীর প্রজ্ঞার সঙ্গে তুলে ধরেছেন প্রখ্যাত আলেম ইয়াহইয়া ইবনু মু’আয (রহ.)। তিনি বলেন—

“আমি তোমাদের দুনিয়া ত্যাগ করার আহ্বান জানাই না; বরং গুনাহ ত্যাগ করার আহ্বান জানাই। কারণ দুনিয়া ত্যাগ করা একটি ফজিলত, আর গুনাহ ত্যাগ করা ফরজ। তাই ফজিলতের আগে ফরজ আদায়ই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।”

এই সংক্ষিপ্ত উক্তির মধ্যেই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলাম মানুষকে সংসারবিমুখ হতে শেখায় না; বরং সংসারের মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি খুঁজে নিতে শেখায়। সম্পদ অর্জনকে নিরুৎসাহিত করে না; বরং সম্পদের প্রতি আসক্তির পরিবর্তে তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে উদ্বুদ্ধ করে।

মানুষের চাহিদা সীমাহীন, কিন্তু প্রকৃত প্রয়োজন সীমিত। অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান জীবনধারণের মৌলিক উপাদান। একজন দ্বীনদার মানুষেরও এসব প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই চাহিদা পূরণের পথ হতে হবে হালাল, পবিত্র ও শরিয়তসম্মত। কারণ সমস্যা সম্পদে নয়; সমস্যা সম্পদের প্রতি অন্ধ আসক্তিতে। প্রয়োজন যখন লোভে রূপ নেয়, তখন মানুষ সম্পদের মালিক হলেও নিজের নফসের বন্দি হয়ে পড়ে। ধন-সম্পদ বাড়তে থাকে, অথচ অন্তরের প্রশান্তি কমতে থাকে।

আরো পড়ুন...  পবিত্র আশুরার রোজা রাখার ফজিলত

দুনিয়ার মোহের এই বাস্তবতা বোঝাতে একটি দৃষ্টান্ত কল্পনা করা যায়। একজন মুসাফির দীর্ঘ সফরে বেরিয়েছে। যাত্রার জন্য যতটুকু রসদ প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক বেশি সংগ্রহ করতেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এরপর বাহনকে সাজাতে লাগল নানান অলংকারে। এই সাজসজ্জার মধ্যেই সে এতটাই নিমগ্ন হয়ে গেল যে খেয়ালই করল না, কাফেলা অনেক আগেই যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। সঙ্গীরা গন্তব্যের পথে এগিয়ে গেছে, আর সে রয়ে গেছে নির্জন প্রান্তরে একা ও অসহায়।

দুনিয়ার মোহে ডুবে থাকা মানুষের অবস্থাও অনেকটা এমনই। সম্পদ, পদমর্যাদা ও ভোগ-বিলাসের পেছনে ছুটতে ছুটতে সে ভুলে যায়—জীবনের প্রকৃত সফর তো আখিরাতের দিকে। একসময় ফিরে তাকিয়ে দেখে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিটিই নেওয়া হয়নি।

তবে ইসলামের শিক্ষা কখনো বৈরাগ্যের নয়। প্রয়োজনীয় সম্পদ অর্জন, পরিবারকে স্বচ্ছল রাখা এবং সম্মানজনক জীবনযাপন করাও দ্বীনের অংশ। কারণ অভাব অনেক সময় মানুষকে দুর্বল করে দেয়, আর বৈধ সামর্থ্য বহু ইবাদত ও কল্যাণকর কাজকে সহজ করে তোলে। তাই দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করাই একজন মুমিনের পরিচয়।

আওন ইবনু আব্দুল্লাহ (রহ.) বলেছেন—

“দুনিয়া ও আখিরাত মানুষের অন্তরে দাঁড়িপাল্লার দুই পাল্লার মতো। একটিকে যত ভারী করবে, অন্যটি তত হালকা হয়ে যাবে।”

এই উপমা মানুষের হৃদয়ের বাস্তবতাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরে। দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগ যত বাড়ে, আখিরাতের প্রতি মনোযোগ তত কমে যায়। আবার যার হৃদয় আখিরাতমুখী, সে দুনিয়াকে ব্যবহার করে; দুনিয়ার দ্বারা ব্যবহৃত হয় না।

আরো পড়ুন...  দোয়া ও ইবাদতে নববর্ষ শুরুর আহ্বান

হাসান বসরি (রহ.)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে করুণ আর্তনাদ কার হবে? তিনি জবাব দিয়েছিলেন—

“যাকে আল্লাহ নিয়ামত দিয়েছিলেন, অথচ সে সেই নিয়ামতই ব্যয় করেছে আল্লাহর অবাধ্যতার পথে।”

এই বক্তব্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সম্পদ নিজে কল্যাণ বা অকল্যাণের উৎস নয়। সম্পদের মূল্য নির্ধারিত হয় তার উৎস ও ব্যবহারের মাধ্যমে। হালাল উপার্জনের একটি রুটিও আল্লাহর কাছে মূল্যবান হতে পারে, আবার হারাম সম্পদের পাহাড়ও চিরস্থায়ী অনুশোচনার কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে, যে সম্পদ মানুষকে আল্লাহর ইবাদতে শক্তি জোগায়, পরিবারকে হালাল আহার দেয়, অসহায়ের মুখে হাসি ফোটায়, দ্বীনের খেদমতে ব্যয় হয় এবং মানবকল্যাণে ভূমিকা রাখে—সেই সম্পদ নিছক অর্থ নয়; তা এক মহামূল্যবান আমানত। এমন সম্পদ দুনিয়ায় মর্যাদা এনে দেয়, আর আখিরাতে হয়ে ওঠে নাজাতের পাথেয়।

অতএব, প্রশ্ন সম্পদ অর্জনের নয়; প্রশ্ন তার উদ্দেশ্যের। দুনিয়া কখনো মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, যদি সে দুনিয়াকে আখিরাতের সোপান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। হালাল উপার্জন, পবিত্র নিয়ত এবং কল্যাণমুখী ব্যয়—এই তিনটি একত্রিত হলে দুনিয়ার কর্মও ইবাদতে রূপ নেয়।

মুমিনের কাছে দুনিয়া গন্তব্য নয়, পথ। সম্পদ অহংকারের অলংকার নয়, আল্লাহর অর্পিত আমানত। আর উপার্জন কেবল জীবিকার ব্যবস্থা নয়, বরং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহিমান্বিত উপায়। যে মানুষ এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে, তার কাছে দুনিয়া ও আখিরাত পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক।

লেখক:
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান।
কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মোরেলগঞ্জে জুলাই শহীদ দিবস পালন, কবর জিয়ারত ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

বিছানায় পড়ে ছিল স্বামী-স্ত্রীর লাশ, পাশেই মিলল শিশুসন্তান ও চিরকুট

শ্রদ্ধা, স্মরণ ও অঙ্গীকারে কিশোরগঞ্জে জুলাই শহীদ দিবস পালন

দুনিয়া যখন আখিরাতের পুঁজি

রায়পুরায় নদীতে ডুবে ৪ মাদরাসাছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু

জুলাই শহীদ দিবসে খাগড়াছড়িতে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও আলোচনা সভা, বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের মতবিনিময়

মাগুরায় যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হলো জুলাই শহীদ দিবস

যথাযোগ্য মর্যাদায় ঝালকাঠিতে পালিত হলো জুলাই শহীদ দিবস

জুলাই শহিদদের স্মরণে কুড়িগ্রামে পুষ্পার্ঘ্য, আলোচনা সভা ও সম্মাননা

মিঠামইন বিএনপি সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম হত্যা: ৩ আসামি গ্রেফতার

১০

জুলাই শহীদ দিবসে মাগুরায় জামায়াতে ইসলামীর র‍্যালি, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল

১১

২৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই স্থায়ী প্রধান, প্রশাসনিক সংকটে মঠবাড়িয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা

১২

তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি গঠনে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই: ইউএনও জাহিদ বিন কাশেম

১৩

গাবুরায় ৭২ পরিবারের মাঝে ১,৮০০ মুরগির বাচ্চা বিতরণ, আয় বৃদ্ধির নতুন উদ্যোগ

১৪

এই কারণেই এবার আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতবে?

১৫

নকল সিগারেট মামলার মধ্যেই নতুন কেলেঙ্কারি, ভদ্দরের ফ্যাক্টরি থেকে উদ্ধার চোরাই মেশিন

১৬

বিশ্বনাথে শাহ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ১৫ অসহায় পরিবারের মাঝে চিকিৎসা সহায়তা বিতরণ

১৭

রামপালে ‘জয় অব গিভিং’ উদ্যোগে ৮০ দুঃস্থ পরিবার পেল গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন সহায়তা

১৮

অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগে মঠবাড়িয়ায় দুই মিটার রিডার অবরুদ্ধ

১৯

নোয়াখালীর উন্নয়নে ব্যতিক্রমধর্মী গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

২০