পৃথিবীতে এমন কিছু সম্পর্ক আছে, যার গভীরতা শব্দ দিয়ে মাপা যায় না। কিছু মানুষের অনুপস্থিতি সময়ের সঙ্গে কমে না; বরং প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঋতু আর প্রতিটি স্মৃতিতে নতুন করে অনুভূত হয়। বাবা তেমনই এক আশ্রয়ের নাম—যিনি সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্নকে ডানা মেলতে শেখান; অথচ নিজের প্রাপ্তি নিয়ে কখনো হিসাব করেন না।
আমার বাবা ১৩ অক্টোবর ২০০২, রোববার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে আমাদের ছেড়ে আপন ঠিকানায় যাত্রা করেন।
আমার কাছে বাবা শুধু একজন অভিভাবক ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমার মহীরুহ, আমার শেকড়, আমার সাহস এবং আমার প্রেরণা। আজও তাঁকে খুঁজি প্রতিটি নির্জন বিকেলে, প্রতিটি ক্লান্ত সন্ধ্যায়, প্রতিটি দীর্ঘ নিশীথে। কখনো মনে হয়, শীতল বাতাসের মৃদু পরশে তিনি এসে মাথায় হাত রেখে বলছেন, “ভয় পেয়ো না, আমি আছি।”
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। হাত বাড়ালেই তাঁকে আর ছোঁয়া যায় না।
মানুষের জীবনে কিছু দৃশ্য কখনো মুছে যায় না। সময়ের ধুলো যতই জমুক, স্মৃতির পাতায় সেগুলো ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাময় স্মৃতি বাবার শেষ মুহূর্ত। সেই সময়ের অনুভূতি আজও আমার হাতের তালুতে জমাট বেঁধে আছে। মনে হয়, সেই উষ্ণতা যেন এখনো কোথাও রয়ে গেছে।
এরপর শেষ গোসল, শেষবারের মতো তাঁকে সাদা কাফনে জড়িয়ে দেওয়া, তিন ভাই মিলে অশ্রুসজল চোখে বাবাকে শেষ বিদায় জানানো—এসব স্মৃতি হৃদয়ের গভীরে এমনভাবে গেঁথে আছে, যা কোনোদিন মুছে যাওয়ার নয়।
মানুষ বলে, সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কিন্তু বাবাকে হারানোর শোকের কোনো পূর্ণ আরোগ্য নেই। কেবল বেঁচে থাকার প্রয়োজনে মানুষ আবার হাসতে শেখে, কাজ করতে শেখে, দায়িত্ব পালন করতে শেখে। অথচ অন্তরের কোথাও এক বিশাল শূন্যতা নীরবে রক্তক্ষরণ করে যায়।
আজও মনে হয়, বাবা যেন পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, “হিসেব করে কদম দাও। সৎ পথে থেকো। মানুষের ক্ষতি করো না।”
তাঁর এই কয়েকটি উপদেশই আমার জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে গেছে। জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে যেন তাঁর সেই কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। যখন কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, তখন মনে হয়—তিনি পাশে থাকলে হয়তো বলতেন, “সত্যের পথ কখনো ছেড়ে যেয়ো না।”
বাবা চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, আদর্শ, সততা এবং ভালোবাসা আজও আমাকে পথ দেখায়। একজন মানুষ হয়তো একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ কখনো মরে না। সত্যিকারের বাবা সন্তানের জীবনে এমন এক বাতিঘর, যার আলো অন্ধকার পথেও দিকনির্দেশনা দেয়।
আজ আমার জীবনে সেই বিশাল বটবৃক্ষটি নেই। যে ছায়ার নিচে নিশ্চিন্তে দাঁড়ানো যেত, যে আশ্রয়ে সব দুঃখ-কষ্ট মুহূর্তেই ছোট হয়ে যেত—সেই আশ্রয় হারিয়ে বুঝেছি, বাবা হারানোর অর্থ কী।
পৃথিবীতে মানুষ যতই সফল হোক, যত সম্মানই অর্জন করুক, বাবার একটি স্নেহভরা ডাকের সমান মূল্য আর কিছুই হতে পারে না।
অনেক সময় মনে হয়, পৃথিবীর এই অগণিত মানুষের ভিড়ে আমার বাবা ছিলেন একেবারেই আমার। তাঁর হাসি, তাঁর বকুনি, তাঁর পরামর্শ, তাঁর স্নেহ—সবই ছিল আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতিগুলো যেন আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে আছে।
আমি জানি, পৃথিবীতে কোটি কোটি বাবা আছেন; কিন্তু প্রত্যেক সন্তানের কাছে তাঁর নিজের বাবাই অনন্য, অদ্বিতীয়।
যাঁদের বাবা এখনো বেঁচে আছেন, তাঁরা হয়তো সব সময় এই আশীর্বাদের মূল্য পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেন না। মানুষ সাধারণত হারানোর পরই প্রাপ্তির প্রকৃত মূল্য বুঝতে শেখে। তাই যতদিন বাবা আছেন, তাঁর পাশে বসুন, তাঁর সঙ্গে কথা বলুন, তাঁর হাতটি ধরে রাখুন।
কারণ এমন একটি দিন আসতে পারে, যখন সেই হাত ধরার আকাঙ্ক্ষা শুধু স্মৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
আমার হৃদয় সবচেয়ে বেশি কেঁপে ওঠে, যখন দেখি কোনো বৃদ্ধ বাবা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অবহেলার শিকার হন। যিনি একসময় সন্তানের জন্য নিজের ক্ষুধা ভুলে গেছেন, আজ তিনিই একমুঠো খাবারের জন্য অপেক্ষা করেন। যিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে তপ্ত রোদে, ঝড়-বৃষ্টিতে পরিশ্রম করেছেন, বার্ধক্যে এসে তিনিই একাকিত্বের বোঝা বহন করেন।
এমন দৃশ্য শুধু একজন বাবার অপমান নয়; এটি মানবতারও পরাজয়।
একজন বাবা কখনো সন্তানের কাছে সম্পদের দাবি করেন না। তিনি চান শুধু একটু সম্মান, একটু ভালোবাসা, একটু খোঁজ নেওয়া। তাঁর চোখের ভাষা যেন বলে—
“আমি তোমাদের জন্য যা করেছি, তার বিনিময়ে কিছু চাই না; শুধু আমাকে ভুলে যেয়ো না।”
সমাজ যত আধুনিক হচ্ছে, প্রযুক্তি যত এগিয়ে যাচ্ছে, পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা যেন কোথাও কোথাও ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অথচ সভ্যতার প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধে।
যে পরিবারে বাবা সম্মানিত হন, সেই পরিবারেই সন্তান মানবিক মূল্যবোধ শিখে বড় হয়। আর যে সমাজে বৃদ্ধ বাবা-মা অবহেলিত হন, সেই সমাজ কখনো প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না।
আজ আমার বাবা পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা মৃত্যুকেও অতিক্রম করেছে। প্রতিটি দোয়ায়, প্রতিটি সৎকর্মে এবং প্রতিটি মানবিক সিদ্ধান্তে আমি তাঁকে স্মরণ করি। আমি বিশ্বাস করি, সন্তানের সৎ জীবনই একজন বাবার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার।
আমার এই ব্যক্তিগত অনুভূতি কেবল আমার একার নয়; পৃথিবীর অসংখ্য সন্তানের হৃদয়েরও একই আর্তি। তাই আজ একটি প্রার্থনাই করতে চাই—পৃথিবীর প্রতিটি বাবা যেন সন্তানের ভালোবাসা, সম্মান ও যত্নে জীবন কাটাতে পারেন।
কোনো বাবা যেন অবহেলায় চোখের জল না ফেলেন। কোনো বাবা যেন ক্ষুধার কষ্টে দিন না কাটান। কোনো বাবা যেন নিজের ঘরেই পর হয়ে না যান।
কারণ বাবা শুধু একটি শব্দ নন। তিনি জীবনের প্রথম নিরাপত্তা, প্রথম শিক্ষক, প্রথম নায়ক এবং প্রথম আশ্রয়। তিনি শেকড়, তিনি মহীরুহ, তিনি নীরব ত্যাগের আরেক নাম।
তাঁর অনুপস্থিতি কখনো পূরণ হয় না; কিন্তু তাঁর আদর্শ বেঁচে থাকে সন্তানের প্রতিটি সৎ পদক্ষেপে।
বাবা, আপনি যেখানেই থাকুন, আল্লাহ আপনার প্রতি অসীম রহমত বর্ষণ করুন। আপনার শেখানো পথেই যেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চলতে পারি। আপনার ছায়া আজ আর মাথার ওপর নেই, কিন্তু আপনার দোয়া, আপনার শিক্ষা এবং আপনার স্মৃতি আমার জীবনের অনন্ত প্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক
মন্তব্য করুন