প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য খ্যাত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবাধে টিলা, পাহাড় ও পাহাড়ি ছড়া কেটে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে। চায়ের রাজ্য হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পর্যটন সম্ভাবনা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়লেও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকাশ্যে ভেকু মেশিন ব্যবহার করে টিলা কাটা, পাহাড়ি ছড়া থেকে সিলিকা বালু উত্তোলন এবং নদী ও ব্রিজের নিচ থেকে পলি মাটি সরিয়ে নেওয়ার মতো পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেকটাই নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের ছয়ঘড়ি এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্রকাশ্যে টিলার লাল মাটি কেটে ট্রাকযোগে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। এতে প্রাকৃতিক টিলাভূমি সমতলে পরিণত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় এ কার্যক্রম চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
একইভাবে আলীনগর ইউনিয়নের সুনছড়া চা বাগান এলাকার প্রাকৃতিক টিলা ও পাহাড়ি ছড়ার বাঁধ কেটে অবৈধভাবে সিলিকা বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ট্রাক, পিকআপ ও ট্রলিযোগে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু পরিবহন করা হলেও প্রশাসনের তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ছে না। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মাঝে মধ্যে বালুবাহী যানবাহন আটক করলেও পরে রহস্যজনক কারণে সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শমশেরনগরের সমাজকর্মী এনামুল হক শামীম জানান, গত ২৩ এপ্রিল রাতে সুনছড়া এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু বহনের সময় একটি ট্রাক স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশ ফাঁড়িতে দেয়। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এদিকে রহিমপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর এলাকায় ধলাই নদীর ওপর নির্মিত স্টিল ব্রিজের নিচ থেকেও অবাধে পলি মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে মাটি কাটতে থাকলে যেকোনো সময় ব্রিজটি ধসে পড়তে পারে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কাও রয়েছে।
শুধু কমলগঞ্জ নয়, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ডলুবাড়ি ও রাধানগর এলাকাতেও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই টিলা ও পাহাড় কেটে রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটন ব্যবসার আড়ালে প্রকৃতিকে ধ্বংস করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে।
এ বিষয়ে কলেজ শিক্ষক জমশেদ আলী, পেশাজীবী সোলেমান মিয়া ও চা শ্রমিক নেতা সীতারাম বীনসহ স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসনের অবহেলার কারণে একের পর এক প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এতে পরিবেশ, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ-কালভার্ট মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, টিলা কাটা ও অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়গুলো সম্পর্কে তিনি অবগত রয়েছেন। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে মৌলভীবাজার জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাহিদুল ইসলাম অতীতে অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে এখনো দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সচেতন সহযোগিতাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
মন্তব্য করুন