বাংলাদেশের চা শিল্পে একের পর এক উৎপাদনের রেকর্ড গড়া হলেও চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনমানের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। চা শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের (বিটিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৭১ বছরের চা শিল্পের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড গড়ে ২০১৯ সালে উৎপাদিত হয় ৯ কোটি ৬০ লাখ ৬৯ হাজার কেজি চা। এর আগে ২০১৮ সালের মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ৮২ দশমিক ১৩ মিলিয়ন কেজি চা, যা সে সময়ের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল। এছাড়া ২০১৬ সালেও উৎপাদনের নতুন মাইলফলক স্থাপিত হয়। উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারাকে চা শিল্পের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যাচ্ছে।
ট্রেড ইউনিয়ন মৌলভীবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাস বলেন, একজন চা শ্রমিককে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, অথচ দিন শেষে তাদের আয় হয় মাত্র ১৮৭ টাকা। এই স্বল্প আয়ে পরিবার চালানো অত্যন্ত কষ্টকর। তিনি অভিযোগ করেন, অধিকাংশ শ্রমিক পর্যাপ্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কাজ বন্ধ করলে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর আশঙ্কাও থাকে।
তিনি আরও বলেন, কিছু চা বাগানে শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়। অনেক জায়গায় শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
জুলেখা চা বাগানের শ্রমিক মেনকা সাঁওতাল জানান, স্বাধীনতার এত বছর পরও তাদের জীবনমানের দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। এখনও তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত অবস্থায় জীবনযাপন করছেন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, দেশে প্রায় ৭ লাখ চা জনগোষ্ঠীর বসবাস। এর মধ্যে নিবন্ধিত শ্রমিক প্রায় ৯৮ হাজার এবং অনিয়মিত শ্রমিক প্রায় ৩০ হাজার। একজন শ্রমিক সপ্তাহে গড়ে প্রায় ১৩০০ টাকা মজুরি পান। কোথাও কোথাও চাল বা আটা দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
দেওরাছড়া চা বাগানের শ্রমিক বৃটিশ ঘাটুয়াল বলেন, একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তির সীমিত আয়ের ওপর পুরো পরিবার নির্ভরশীল। ছোট ও জরাজীর্ণ ঘরে সন্তান ও গবাদিপশু নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় অনেক পরিবারকে।
সিলেট চা জনগোষ্ঠী ছাত্র যুব কল্যাণ পরিষদের সভাপতি দিলিপ কুর্মী বলেন, শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার অধিকাংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে বয়স্ক শ্রমিকরা চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত থাকেন।
বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের উপদেষ্টা দেবাশীষ যাদব বলেন, চা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি থাকলেও তাদের জাতিগত পরিচয় ও স্বীকৃতি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অন্যদিকে, চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু ধলাই ভ্যালির সভাপতি ধনা বাউরি অভিযোগ করেন, অনেক বাগানে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে দেওয়া হয় না। সহজলভ্য মদের দোকানের মাধ্যমে শ্রমিকদের দুর্বল করে রাখার চেষ্টাও করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তবে বাংলাদেশ চা সংসদ সিলেট ভ্যালির সভাপতি জি এম শিবলী বলেন, চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নয়ন হচ্ছে।
মন্তব্য করুন