মাগুরা, ঝিনাইদহ ও রাজবাড়ী—এই তিন জেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী লাঙ্গলবাঁধ বাজার। দীর্ঘদিন ধরে এ বাজারটি স্বর্ণ ব্যবসার জন্য পরিচিত হলেও সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে, জুয়েলারি ব্যবসার আড়ালে সেখানে জমজমাটভাবে চলছে অবৈধ সুদের কারবার ও স্বর্ণ বন্ধকী ব্যবসা। স্থানীয়দের দাবি, বাজারের বহু জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে উচ্চ সুদে অর্থ লেনদেন করছে, যার ফলে অসহায় মানুষ প্রতারিত ও সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, আধুনিক ডেকোরেশন ও বাহারি ডিজাইনের স্বর্ণালঙ্কারে সাজানো রয়েছে অসংখ্য জুয়েলারি দোকান। বাইরে থেকে সাধারণ স্বর্ণের দোকান মনে হলেও ভেতরে গোপনে পরিচালিত হচ্ছে বন্ধকী ঋণ ও সুদের ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লাঙ্গলবাঁধ বাজারে প্রায় শতাধিক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে স্বর্ণ বন্ধক রেখে ঋণ দেওয়ার ব্যবসা চালু রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতি ১০০ টাকায় ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত সুদ নেওয়া হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই জরুরি আর্থিক সংকটে পড়ে স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা নেন। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে না পারলে তাদের স্বর্ণ আর ফেরত পান না।
ভুক্তভোগীরা জানান, ব্যাংক বা ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে দ্রুত ঋণ পাওয়া কঠিন হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের কাছে যান। সেখানে কোনো কাগজপত্র বা জটিলতা ছাড়াই দ্রুত টাকা পাওয়া যায়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সুদের ফাঁদে ফেলছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। টানা তিন মাস সুদের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে বন্ধক রাখা স্বর্ণ গলিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বন্ধকী ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্রাহকদের তথ্য, স্বাক্ষর ও ফোন নম্বর সংরক্ষণ করে আলাদা খাতা রাখা হয়। পাশাপাশি স্বর্ণ ও টাকার পরিমাণ উল্লেখ করে গ্রাহকদের একটি কার্ডও দেওয়া হয়। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই এ পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে।
লাঙ্গলবাঁধ বাজার কমিটির সভাপতি মোঃ ইসমাইল শেখ বলেন, “স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গ্রাহকদের বিভিন্ন সময় সমস্যা দেখা দেয়। তখন বিচার-সালিশের জন্য তারা বাজার কমিটির কাছে আসেন। তবে কীভাবে তারা এ ব্যবসা পরিচালনা করেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত আমাদের জানা নেই।”
এ বিষয়ে ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোছাঃ হাসিনা খাতুন বলেন, “স্বর্ণ কেনাবেচার জন্য সরকারি বিধি মেনে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়। কিন্তু বন্ধকী ব্যবসার জন্য কোনো ধরনের লাইসেন্স ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া হয় না।”
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল বলেন, “জুয়েলারি ব্যবসার আড়ালে বন্ধকী সুদের ব্যবসা সম্পূর্ণ অবৈধ। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অবৈধ সুদের কারবার বন্ধে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষকে সচেতন করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মন্তব্য করুন