সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ (এমআর)দের অবাধ যাতায়াত এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে যোগাযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন নাগরিক, রোগী ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—ঔষধ বিক্রির দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধিরা কেন দিনের পর দিন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের কক্ষ ঘিরে অবস্থান করছেন, এবং এতে চিকিৎসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা কতটা বজায় থাকছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি বক্তব্যে বলা হয়, “ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভদের কাজ হওয়া উচিত ফার্মেসি ও ওষুধ বিক্রয়কেন্দ্রভিত্তিক জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তারা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন। এতে সাধারণ মানুষের মনে চিকিৎসা ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।”
এ বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে জনমনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘ পড়াশোনা, ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন চিকিৎসক ওষুধ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করেন। তাই চিকিৎসকদের কাছে ওষুধের গুণাগুণ বা ব্যবহারবিধি ব্যাখ্যা করতে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অতিরিক্ত উপস্থিতি প্রয়োজনীয় কিনা—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
রোগীদের অভিযোগ, অনেক সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে এমআরদের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে সাধারণ রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগীদের মধ্যে বিরক্তি ও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
স্বাস্থ্যখাত বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, সরকারি হাসপাতালে এমআরদের প্রবেশ ও কার্যক্রমের জন্য স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। সরকারি কর্মঘণ্টায় চিকিৎসকদের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের দীর্ঘ বৈঠক জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। ফলে স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে ওষুধ কোম্পানির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তাদের দাবি, নতুন ওষুধ, ডোজ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ব্যবহারবিধি এবং গবেষণালব্ধ তথ্য চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের মূল দায়িত্ব। বিশ্বব্যাপী এটি একটি স্বীকৃত পেশাগত কার্যক্রম বলেও তারা উল্লেখ করেন। তাদের মতে, চিকিৎসকদের সর্বশেষ তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে রোগীরা উন্নত চিকিৎসা সেবা পেতে পারেন।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন, রোগীর স্বার্থ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা সেবা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে এমআরদের প্রবেশ ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ ও রোগীদের সেবার মান বজায় রাখতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন