নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা’দ।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ, আজকের আলোচনার বিষয় “সুন্দর ব্যবহার ও আচরণের বিনিময়ে জান্নাত”। কোরআন ও হাদিসের আলোকে সংক্ষেপে এ বিষয়ে কিছু কথা তুলে ধরছি। ওয়ামা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ।
মানুষের একটি মিষ্টি কথা যেমন অন্যের হৃদয় জয় করতে পারে, তেমনি একটি কটু কথা বা অশোভন আচরণ মানুষের মনে গভীর কষ্টের সৃষ্টি করে। তাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আমাদের উচিত সব সময় মানুষের সঙ্গে নম্র, ভদ্র ও সুন্দর আচরণ করা।
সুন্দর ব্যবহার বলতে বোঝায়—সৌজন্যের সঙ্গে কথা বলা, দেখা হলে সালাম দেওয়া, কুশল বিনিময় করা, কর্কশ ভাষা পরিহার করা, ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকা, রাগ বা ধমকের সুরে কথা না বলা, পরনিন্দা না করা, কাউকে অপমান না করা, উচ্চস্বরে কথা না বলা, হাসিমুখে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা, অন্যের সুখে আনন্দিত হওয়া এবং দুঃখে পাশে দাঁড়ানো। বিপদে-আপদে সহানুভূতি প্রকাশ করাও উত্তম চরিত্রের অন্যতম নিদর্শন।
প্রত্যেক মানুষই সুন্দর আচরণ প্রত্যাশা করে। কিন্তু বাস্তব জীবনে আমরা অনেক সময় নিজের আচরণের প্রতি সচেতন থাকি না। অথচ সামান্য একটি অসৌজন্যমূলক আচরণও একজন মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের কারণ হতে পারে। তাই আমাদের এমনভাবে চলা উচিত, যাতে আমাদের কথা বা ব্যবহারে কেউ আঘাত না পায়।
যার চরিত্র ও ব্যবহার যত সুন্দর, মানুষ তাকে তত বেশি ভালোবাসে, সম্মান করে এবং শ্রদ্ধার চোখে দেখে। বিপরীতে, যার আচরণ রূঢ় ও অশোভন, মানুষ তাকে এড়িয়ে চলে। সুন্দর ব্যবহার একজন মানুষের সুন্দর মনের পরিচয় বহন করে।
ইসলামে উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আচরণের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সুন্দর আচরণের মাধ্যমে যেমন মানুষের ভালোবাসা অর্জিত হয়, তেমনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিও লাভ করা যায়। পরকালে এর প্রতিদান হিসেবে রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ।
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
“কিয়ামতের দিন মুমিনের আমলনামায় উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী কোনো আমল থাকবে না। আল্লাহ তাআলা অশ্লীলভাষী ও অশোভন আচরণকারীকে অপছন্দ করেন। আর উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি নফল রোজা ও তাহাজ্জুদের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।”
— সুনানে তিরমিজি
তিনি আরও বলেছেন,
“সবচেয়ে বেশি যে দুটি জিনিস মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে, তা হলো আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র। আর সবচেয়ে বেশি যে দুটি জিনিস মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে, তা হলো মানুষের মুখ (জিহ্বা) ও লজ্জাস্থান।”
— সুনানে তিরমিজি
আরও একটি হাদিসে এসেছে,
“উত্তম চরিত্রই নেক আমল।”
— সহিহ মুসলিম
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেন,
“তোমাদের মধ্যে যার আচার-ব্যবহার সবচেয়ে সুন্দর, সে-ই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে।”
— সুনানে তিরমিজি
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন,
“অশ্লীল কথা ও অশোভন আচরণের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। যার চরিত্র যত সুন্দর, তার ইসলামও তত সুন্দর।”
— মুসনাদে আহমদ
আরেকটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি উত্তম চরিত্রের অধিকারী, আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে একটি ঘরের জামিন।”
— সুনানে আবু দাউদ
তিনি আরও বলেছেন,
“যাকে নম্রতা ও কোমল স্বভাব দান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের সব কল্যাণই দান করা হয়েছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ বাড়িঘর ও জনপদে বরকত বৃদ্ধি করে এবং আয়ু দীর্ঘ হওয়ার কারণ হয়।”
— মুসনাদে আহমদ
অতএব, সুন্দর আচরণ শুধু সামাজিক সৌন্দর্য নয়; এটি একজন মুমিনের ঈমানের পরিচয় এবং জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম। তাই আসুন, আমরা পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সহকর্মী এবং সমাজের সকল মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করি এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আচরণের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক:
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
সাবেক ইমাম ও খতীব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।
সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।
সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।
মন্তব্য করুন