জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে নতুন পাট উঠতে শুরু করেছে। গত বছরের তুলনায় এবার মণপ্রতি প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা বেশি দামে পাট বিক্রি হওয়ায় খুশি পাটচাষিরা। ভালো ফলন, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং বাজারে উচ্চমূল্য—সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে কৃষকদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার।
শুক্রবার সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা যায়, নতুন পাট মণপ্রতি ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত বছরের মৌসুমের শুরুতে একই মানের পাটের দাম ছিল মণপ্রতি ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা। ফলে এবার প্রতি মণে কৃষকরা অতিরিক্ত ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম পাচ্ছেন।
সাপধরী ইউনিয়নের কাঁসারিডোবা গ্রামের কৃষক সামিউল চৌধুরী বলেন, “এবার পাটের ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। তবে পাটচাষ আরও লাভজনক করতে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।”
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ইসলামপুর উপজেলায় ৭ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে ফলনও ভালো হয়েছে। গত বছর বৃষ্টির অভাবে পাট জাগ দিতে কৃষকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হলেও এবার পর্যাপ্ত পানি থাকায় সে সমস্যায় পড়তে হয়নি।
তবে বাজারে পাটের দাম বাড়লেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। বিশেষ করে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাট উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
গত বছর যেখানে একজন শ্রমিককে দৈনিক ৭০০ টাকা মজুরি দিতে হতো, সেখানে এবার পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজে শ্রমিকপ্রতি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। ফলে প্রতি মণ পাট উৎপাদনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি।
উপজেলার বৃহত্তম পাটের হাট গুঠাইলসহ বিভিন্ন হাটে গত দুই সপ্তাহ ধরে নতুন পাটের কেনাবেচা চলছে। মৌসুমের শুরুতে আগাম চাষ করা কৃষকরাই পাট বিক্রি করায় বাজারে এখনো সরবরাহ তুলনামূলক কম রয়েছে।
গুঠাইল হাটের পাট ব্যবসায়ী হাসমত আলী বলেন, “মৌসুমের শুরু থেকেই ভালো পরিমাণ পাট বাজারে আসছে। সপ্তাহখানেক আগে মণপ্রতি ৪ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হওয়া পাট এখন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকরা ভালো দাম পেয়ে সন্তুষ্ট।”
তবে বাজারে পাটের সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন কৃষকরা।
গোয়ালেরচর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামের কুদ্দুস মিয়া এবং লক্ষ্মীপুর গ্রামের সালাম ও হোসেন জানান, বর্তমানে পাটের দাম ভালো থাকলেও কয়েক সপ্তাহ পর বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যেতে পারে। এ কারণে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তারা কিছুটা উদ্বিগ্ন।
ইসলামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল আহমেদ বলেন, “আবহাওয়া, ফলন ও বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় এবার পাটচাষিরা লাভজনক অবস্থানে রয়েছেন। আমাদের হিসাবে প্রতি মণে কৃষক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করছেন। তবে এখনো বাজারে পাটের পূর্ণ সরবরাহ শুরু হয়নি। আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহ পর বাজার স্বাভাবিক হলে প্রকৃত মূল্য পরিস্থিতি বোঝা যাবে।”
ভালো ফলন, পর্যাপ্ত পানি এবং সন্তোষজনক বাজারমূল্যের কারণে ইসলামপুরের পাটচাষিদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা—পুরো মৌসুমজুড়ে যেন পাটের বাজারদর স্থিতিশীল থাকে এবং পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য পান কৃষকরা।
মন্তব্য করুন