নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কচুবাড়িয়া মৌজায় জাল দলিল ব্যবহার করে জমি নামজারি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভূমি অফিসের নায়েব ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি প্রভাবশালী ভূমি জালিয়াত চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে শুনানি ছাড়াই গোপনে একাধিক জমি নামজারি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লোহাগড়া পৌর শহরের ৯৬ নম্বর কচুবাড়িয়া মৌজার আরএস ২৫৯ নম্বর খতিয়ানের জমি থেকে শ্রী সুভাস চন্দ্র দাশ ১৯৯৭ সালের ১৩ মার্চ ১২২৪ নম্বর দলিলের মাধ্যমে শ্রী খোকন কুমার দাশের কাছ থেকে ৬১ শতক জমি ক্রয় করেন।
অভিযোগ রয়েছে, দলিলে উল্লেখিত আরএস ২৫৯ নম্বর খতিয়ানের দুটি দাগে মোট ২০ শতক জমির রেকর্ডীয় মালিক ছিলেন মফিজুর রহমানসহ অন্যরা। পরে একই মৌজার আরএস ২৬২ নম্বর খতিয়ান অন্তর্ভুক্ত করে জালিয়াতির মাধ্যমে ১২২৪ নম্বরের ভিন্ন একটি দলিল তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দলিল ব্যবহার করে ভূমি অফিস ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর নামজারি কেস নম্বর ৮৯১/১৯-২০-এর মাধ্যমে মোট ১৯টি দাগের ৮৯ শতক জমি নামজারি করা হয়। নায়েব মোল্যা মো. হায়দার আলীর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো শুনানি ছাড়াই একতরফাভাবে ও গোপনে জমিগুলো পৃথক ৯০৩ নম্বর নামজারি খতিয়ানভুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তৎকালীন লোহাগড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুকুল কুমার মৈত্রের সময় ওই নামজারি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই খতিয়ানে বিবেকানন্দ দাসের একাধিক দাগের জমি এবং জগন্নাথ পালের তিন শতক ক্রয়কৃত জমিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জগন্নাথ পাল ২০০৭ সালে নামজারি কেস নম্বর ২৬২/১-এর মাধ্যমে পৃথক খতিয়ানভুক্ত করে জমির কর ও খাজনা পরিশোধ করে আসছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২১১ নম্বর দাগের সরকারি এক নম্বর খাস খতিয়ানের জমি এবং সরকারি কাঁচা রাস্তার অংশও ব্যক্তিমালিকানার ওই নামজারি খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অপরদিকে, পৈতৃক ও ওয়ারিশসূত্রে জমির মালিকানা দাবি করে বিবেকানন্দ দাস ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর নড়াইলের লোহাগড়া সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা নম্বর ৯৪/০৯ দায়ের করেন। মামলায় ৯৯টি দাগে চার একর ৩৭ শতক জমি নিয়ে ফোর সেকশন পার্টিশন স্যুট এবং ২৩ শতক জমির ওপর আমানতের দাবি করা হয়।
মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিরোধীয় জমিতে উভয় পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন আদালত।
তবে আদালতের ওই নির্দেশনা উপেক্ষা করে ২০২৫ সালের ২ মে মিউটেশন কেস নম্বর ৭৯৮৯/২৪-২৫-এর মাধ্যমে বিরোধীয় ১৩টি দাগের এক একর সাড়ে ৩৭ শতক জমি নতুন করে নামজারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, লক্ষ্মীপাশা ভূমি অফিসের নায়েব শেখ মো. আব্দুল মোতালেবের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নাজির, কানুনগো ও অফিস সহকারীর সহযোগিতায় কোনো শুনানি ছাড়াই একতরফাভাবে ও গোপনে জমিগুলো পৃথক ২৫-১৮৬৭ নম্বর নামজারি খতিয়ানভুক্ত করা হয়। তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিঠুন মৈত্রের সময় এ নামজারি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নামজারি দুটি বাতিলের দাবিতে ভূমি আইনের ১৫০ ধারায় বিবেকানন্দ দাস বাদী হয়ে লোহাগড়া উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে পৃথক দুটি মিস কেস দায়ের করেন। মামলা দুটির নম্বর ৯১/২৬ ও ৯৫/২৬।
উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে গত ২৬ জুলাই মিস কেস দুটি শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছিলেন লোহাগড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুস্মিতা সাহা। নির্ধারিত দিনে বাদী ও বিবাদীপক্ষ উপস্থিত থাকলেও সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনুপস্থিত থাকায় সেদিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।
উল্লেখ্য, সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুকুল কুমার মৈত্র ও মিঠুন মৈত্র পরস্পরের চাচা-ভাতিজা বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাদের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার রামদিয়া গ্রামে।
স্থানীয়দের মধ্যে তাদের দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে অতীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জাল দলিল ও জালিয়াতির মাধ্যমে করা নামজারি বাতিলের বিষয়ে সদ্য বিদায়ী লোহাগড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুস্মিতা সাহার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেন।
মন্তব্য করুন