গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তীব্র বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিন-রাতে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উপজেলার প্রায় ১০ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে মৌচাক, তেলিরচালা, চন্দ্রা ও হরতকিতলা এলাকার শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে মৌচাক, তেলিরচালা, চন্দ্রা ও হরতকিতলা এলাকার গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোর চাহিদাই ১২০ মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি ও গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে ৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকেরও কম হওয়ায় রেশনিং করে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে একদিকে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে আবাসিক গ্রাহকদেরও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে কালিয়াকৈর ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে বিদ্যুৎ সংকটের ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ও স্বজনদের হাতপাখা কিংবা ফাইল দিয়ে বাতাস করতে দেখা যায়।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সাদিয়া তানসিম আক্তার মুনমুন বলেন, দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। গর্ভবতী নারীদের সিজারিয়ান অপারেশন, রোগীদের নেবুলাইজার, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, এক্স-রে ও প্যাথলজি পরীক্ষায় সমস্যা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে জেনারেটরও প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ সময় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ সংকটে মৌচাক ও চন্দ্রার হরতকিতলা এলাকার বিভিন্ন গার্মেন্টস ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্থানীয় শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, কোথাও কোথাও উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
স্থানীয় বিজিএমইএ নেতারা আশঙ্কা করছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এমনকি বিদেশি ক্রয়াদেশ বাতিল এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বিদ্যুৎ না থাকায় গভীর নলকূপ ও সেচ পাম্প চালানোও ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমন চাষিরা সময়মতো জমিতে সেচ দিতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে পানির পাম্প চালানো না যাওয়ায় কোথাও কোথাও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কম্পিউটার ল্যাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারছে না।
রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় অন্ধকার নেমে আসছে। এতে চুরি-ছিনতাইয়ের আশঙ্কাও বেড়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
চলমান বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষুব্ধ হয়ে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছে কালিয়াকৈর উপজেলা নাগরিক কমিটি ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন।
তাদের দাবি, শিল্পাঞ্চল হিসেবে কালিয়াকৈরের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং শিল্প ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে কঠোর আন্দোলন ও সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
মন্তব্য করুন