ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ২৪৩ নং সংসদীয় আসন—ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর)—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত আসন। স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিনিধিত্ব লক্ষ্য করা গেছে। ফলে এই আসনকে অনেকেই ‘ভোটার-নির্ভর’ বা ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির’ একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখেন।
স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এডভোকেট মোহাম্মদ ছায়েদুল হক প্রথম এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদে স্বতন্ত্র প্রার্থী উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া জয় লাভ করেন। তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদে (১৯৮৬ ও ১৯৮৮) জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. মোজাম্মেল হক (কাপ্তান মিয়া) পরপর দুইবার নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদে জাতীয় পার্টির সৈয়দ মোর্শেদ কামাল নির্বাচিত হলেও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম শাফি মাহমুদ এমপি হন। তবে একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আবারও আওয়ামী লীগ থেকে এডভোকেট মো. ছায়েদুল হক নির্বাচিত হন।
এরপর অষ্টম (২০০১), নবম (২০০৮) ও দশম (২০১৪) সংসদ নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। দীর্ঘ সময় ধরে টানা চারবার নির্বাচিত হয়ে তিনি নাসিরনগরের রাজনীতিতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে (২০১৮) আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বদরুদ্দোজ্জা মো. ফরহাদ হোসেন সংগ্রাম নির্বাচিত হন।
তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৪) এ এই আসনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা যায়। স্বতন্ত্র প্রার্থী ও শিল্পপতি এস এ কে একরামুজ্জামান (সুখন) নির্বাচিত হয়ে আসনটির রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেন। তার বিজয় প্রমাণ করে যে, দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত প্রভাব নাসিরনগরের ভোটারদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে কোনো একটি দল দীর্ঘমেয়াদে একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখতে পারেনি। আওয়ামী লীগের প্রভাব থাকলেও জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয় ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটায়। স্থানীয় উন্নয়ন, ব্যক্তিগত ইমেজ, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতৃত্ব এখানে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় সক্রিয় হয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন, রাজনৈতিক জোট, উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ঐক্যই নির্ধারণ করবে—আগামী সংসদে ২৪৩ নং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের প্রতিনিধিত্ব কার হাতে যাবে।
শেষ পর্যন্ত সব সিদ্ধান্তই আসবে ভোটারদের রায়ের মাধ্যমে। নাসিরনগরের মানুষ কাকে তাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে সংসদে পাঠাবেন—সেই অপেক্ষায় এখন পুরো এলাকা।
মন্তব্য করুন