
মেজর সিনহা হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাসের হাতে অমানবিক নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খানের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৬টি মিথ্যা মামলা ৭ বছরেও প্রত্যাহার হয়নি। আইনের শাসন কোথায়- এই প্রশ্ন এখন নির্যাতিত এই সাংবাদিকের পরিবার ও স্থানীয় সাংবাদিক মহলে।
২০১৯ সালে টেকনাফের সাবেক এমপি আবদুরহমান বদি এবং ওসি প্রদীপের মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে “টাকা না দিলে ক্রসফায়ার দেন টেকনাফের ওসি” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেন দৈনিক কক্সবাজার বাণীর সম্পাদক ও প্রকাশক ফরিদুল মোস্তফা খান। ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে তাকে ঢাকা থেকে তুলে এনে পৈশাচিক নির্যাতন চালায় ওসি প্রদীপ। পরে অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির ৬টি সাজানো মামলা দিয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়।
টানা ১১ মাস ৫ দিন জেল খেটে জামিনে মুক্তি পান ফরিদুল। এরপর থেকে মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার ধরনা দিচ্ছেন তিনি। স্থানীয় সাংবাদিকরাও দফায় দফায় মানববন্ধন, স্মারকলিপি পেশসহ নানা কর্মসূচি চালিয়েছেন।
মামলার খরচ চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন ফরিদুল। নিরাপত্তাহীনতাসহ মানবেতর জীবনযাপন করছে তার পরিবার। প্রায় ৭ বছর আগে জামিনে মুক্তির পর এবং এর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, ডিসি, এসপিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে আবেদন নিবেদন করা হলেও রহস্যজনক কারণে তা ঝুলে আছে।
সর্বশেষ আওয়ামী সরকার পতনের পর কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা, রাষ্ট্রপতি, তথ্য মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়ে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন ফরিদুল মোস্তফা খান। কিন্তু কোনো সহযোগিতা পাননি। নতুন সরকার গঠনের পর গত ৯ মার্চ ২০২৬ আবারও কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, আইন মন্ত্রী এবং জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন তিনি।
ফরিদুল মোস্তফা খান বলেন, “মামলার বোঝা আর সইতে পারছি না। দিন দিন আর্থিক দৈন্যদশা বেড়েই চলেছে। আমি সীমাহীন মানবেতর জীবনযাপন করছি।”
এদিকে, সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খান জানান, সাজানো মামলায় কারাভোগের পর জামিনে এসে প্রদীপ গংয়ের বিরুদ্ধে আদালতে তার দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলাটি আজও রেকর্ড হয়নি। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে গত ৫ বছর ধরে পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বারবার সময়ের দরখাস্ত দিয়ে সময়ক্ষেপণ করায় তার আইনজীবীরা মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে আমলে নেওয়ার আবেদন করলেও তা কার্যকর হয়নি।
ফরিদুলের সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, থানার রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা, সিডিএমএস সংশোধন ও জীবনের নিরাপত্তার দাবিতে তার স্ত্রীর দায়েরকৃত হাইকোর্টে রিট আবেদনটিও নিষ্পত্তি হয়নি গত ৬ বছরে। কেন তার জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া হবে না- মর্মে স্বরাষ্ট্র সচিব, কক্সবাজারের ডিসি, এসপিসহ বিবাদীদের রুলেই আটকে আছে রিট পিটিশনটি।
অন্যদিকে, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) এ ঘটনার ৪ সপ্তাহের ভেতরে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও পিবিআই রহস্যজনক কারণে গত ৬ বছর ধরে হাইকোর্টে কোনো প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে না।
শুধু তাই নয়, কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে ফরিদুল তার মেয়াদোত্তীর্ণ ডিজিটাল পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করলেও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের অজুহাতে সেটি স্থগিত করে দেন পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
মিথ্যা ও সাজানো মামলাগুলোর বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তার পরিবার ও স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ।
মন্তব্য করুন