পরিতোষ কুমার বৈদ্য, শ্যামনগর প্রতিনিধি
১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

দুর্যোগ-দুর্ভোগ পেরিয়ে প্রত্যন্ত স্কুলে পৌঁছে যাচ্ছে শিশুদের পুষ্টিকর টিফিন

একদিকে বৈরী আবহাওয়া, অন্যদিকে কাঁচা-দুর্গম সড়ক ও নদীপথ। বর্ষায় কোথাও কোমরসমান পানি, কোথাও ভাঙাচোরা রাস্তা। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে নেই শিশুদের পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম। প্রতিদিন প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ডিম, কলা ও পুষ্টিকর বনরুটি। এতে শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও ভর্তি আগ্রহও বাড়ছে।

সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পাইলট ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচির এমনই একটি চিত্র দেখা গেছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলায়। সরকারের নির্দেশনায় কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুশীলন। দুর্যোগপ্রবণ এই জনপদে নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের কাছে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে সংস্থাটি।

শ্যামনগর উপজেলার ১৯১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৫ হাজার ৮১৫ শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ছয়টি উপজেলার মধ্যে শ্যামনগরেই সর্বাধিক বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীকে কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুদের জন্য প্রতিদিনের এই খাবার পরিবার ও বিদ্যালয়—দুই পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্যামনগরের ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় খাবার পৌঁছাতে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ৩০টি বিদ্যালয়ে খাবার পৌঁছে দিতে অনেক সময় পিকআপের পাশাপাশি ট্রলারের ওপরও নির্ভর করতে হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কাঁচা রাস্তা ও নদীপথে খাদ্য পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরপরও নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

আরো পড়ুন...  নোয়াখালীর উন্নয়নে ব্যতিক্রমধর্মী গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

১৬২ নম্বর আটুলিয়া আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীনেশ চন্দ্র মন্ডল বলেন, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর পর বিদ্যালয়ে শুধু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিই বাড়েনি, নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির হারও বেড়েছে। অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুরা পুষ্টিকর খাবার পাওয়ায় তারা আরও আগ্রহী হয়ে উঠছে।

তিনি বলেন, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য এ কর্মসূচি বাড়তি সহায়তা হিসেবে কাজ করছে এবং শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ওই বিদ্যালয়ের অভিভাবক জেসমিন আক্তার বলেন, “আমাদের মতো নিম্নবিত্ত ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার পরিবারের জন্য প্রতিদিন স্কুলে এমন খাবারের ব্যবস্থা হওয়া খুবই স্বস্তির। অনেক দিন পর্যাপ্ত খাবার না খেয়েই সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হতো। এখন স্কুলে ডিম, কলা ও পুষ্টিকর বনরুটি পাওয়ায় শিশুরা স্কুলে যেতে আগ্রহী হচ্ছে।”

দেশের চারটি জেলার ছয়টি উপজেলায় বর্তমানে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে ‘সুশীলন’। সংস্থাটির উপপরিচালক শাহিনা পারভীন বলেন, শ্যামনগরে কার্যক্রম পরিচালনায় সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। উপকূলীয় এই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নদী ও খালবেষ্টিত। অনেক বিদ্যালয়ে সড়ক যোগাযোগ দুর্বল। বর্ষা ও দুর্যোগের সময় যোগাযোগব্যবস্থা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, দুর্যোগের সময় ট্রলারে মালামাল পরিবহনে খরচ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে খাবার ভিজে যাওয়া বা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। সব ধরনের সংকট মোকাবিলা করে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। দুর্যোগের সতর্কবার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হয়।

আরো পড়ুন...  চাঁচড়ায় ৩ কিলোমিটার খাল ভরাট, ১০ গ্রামের ফসল ডুবির শঙ্কায় কৃষক

সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. এনামূল হক বলেন, উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। শ্যামনগরের মতো দুর্গম এলাকায় প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও নিয়মিত স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এরপরও সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, এই কর্মসূচির ফলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি ঝরে পড়া রোধেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কর্মসূচির মান, খাবারের গুণগত মান ও নিয়মিত বিতরণ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পর্যাপ্ত পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দরিদ্র ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার অনেক পরিবারের পক্ষে প্রতিদিন শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কঠিন। বিদ্যালয়ভিত্তিক খাবার কর্মসূচি সেই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তাদের মতে, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও ভর্তি আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি ঝরে পড়া রোধেও এ কর্মসূচি ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ফলে দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় শিক্ষা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার উদ্যোগ একসঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩ হাজারে রাত্রিযাপনের চুক্তিতে ১ হাজার পরিশোধের জেরে হত্যা, আটক-২

১

মোরেলগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু: প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত

২

“শিশুবিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়” মোরেলগঞ্জে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত

৩

আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসে মোরেলগঞ্জে র‌্যালী আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত 

৪

মোরেলগঞ্জে শিক্ষকদের জিপিএফ ফান্ডের ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ কারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন

৫

মোরেলগঞ্জে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত

৬

১৩৮৬ শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করলো রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র

৭

কোষ্ট গার্ড পশ্চিম জোনের অভিযানে উদ্ধার ৪জেলে

৮

মোরেলগঞ্জে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে জাল ধ্বংস, দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা

৯

মোরেলগঞ্জে ভূমিহীন নরেনের চায়ের দোকান দখলের চেষ্টার অভিযোগ

১০

সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার

১১

ওমরাহ শেষে এলাকায় ফিরে কর্মীদের ভালোবাসায় সিক্ত এমপি আব্দুল আলীম

১২

বাগেরহাটে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের জলবায়ু সংক্রান্ত সক্ষমতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত

১৩

গৌরীপুরে সাংবাদিক ঐক্য ফোরামের প্রতিবাদ সভা

১৪

কক্সবাজার-মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় জলদস্যু দমনে কোস্ট গার্ডের সাঁড়াশি অভিযান

১৫

মোরেলগঞ্জে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা

১৬

মোরেলগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডে ঘর হারিয়ে ২০ দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে শ্রমিক পরিবার

১৭

সুন্দরবনে পর্যটকবাহী জাহাজে ডাকাতি চেষ্টার খবরটি বানোয়াট- টোয়াস

১৮

মোরেলগঞ্জে প্রাথমিকের ৪৪ জন সহকারি শিক্ষককে বরণ করে নিলেন শিক্ষক সমিতি

১৯

মৎস্য ঘেরের ভেড়িতে তরমুজ চাষে বাজিমাত: সফল মোরেলগঞ্জের তরুণ উদ্যোক্তা মাহবুব

২০