বাংলাদেশে ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আঘাত সবসময় ইসলামবিদ্বেষী শক্তির কাছ থেকে আসেনি; অনেক সময় ইসলামের ক্ষতি হয়েছে ইসলামের নাম ব্যবহারকারীদের হাতেই। বর্তমান বাস্তবতায় ধর্মীয় অঙ্গনের একটি অংশ এমন এক প্রবণতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে নববী দাওয়াতের জায়গা দখল করছে ব্যক্তিপূজা, জ্ঞানের পরিবর্তে আবেগ, প্রজ্ঞার বদলে উসকানি এবং আখিরাতমুখী দায়বদ্ধতার পরিবর্তে বাজারমুখী জনপ্রিয়তা।
একসময় ওয়াজ-মাহফিল ছিল কুরআন-সুন্নাহর আলোকে মানুষকে সংশোধনের ময়দান। সেখানে ঈমান, আমল, চরিত্র গঠন ও আত্মশুদ্ধির আলোচনা হতো। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে সেই মঞ্চ পরিণত হয়েছে প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনীতে। একজন বক্তার গ্রহণযোগ্যতা তার ইলম, গবেষণা বা আমল দিয়ে নয়; বরং কত দ্রুত তিনি ভাইরাল হতে পারেন, কত জোরে কথা বলতে পারেন কিংবা কত মানুষের আবেগ নাড়া দিতে পারেন—তা দিয়েই পরিমাপ করা হচ্ছে।
ফলে ধর্মীয় আলোচনা ধীরে ধীরে জ্ঞানভিত্তিক চর্চা থেকে সরে গিয়ে বিনোদননির্ভর উপস্থাপনায় রূপ নিচ্ছে। ইসলামের গভীর বোধ, ফিকহ, আকিদা, তাফসির, হাদিস ও মুসলিম সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে। জায়গা করে নিচ্ছে আবেগঘন স্লোগান, চটকদার বক্তব্য এবং কখনো কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ।
পবিত্র কুরআন দাওয়াতের যে নীতি নির্ধারণ করেছে, তার সঙ্গে এই প্রবণতার স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।” (সূরা আন-নাহল: ১২৫)
দাওয়াতের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত হিকমাহ, জ্ঞান, ধৈর্য ও উত্তম চরিত্র। অথচ বর্তমানের কিছু বক্তার বক্তব্যে ভিন্নমতকে বিদ্রূপ করা, প্রতিপক্ষকে হেয় করা কিংবা আলেমদের বিরুদ্ধে কটূক্তি করার প্রবণতা দেখা যায়। এতে ইসলাম শক্তিশালী হয় না; বরং সাধারণ মানুষের মনে ধর্মীয় নেতৃত্ব সম্পর্কে অনাস্থা তৈরি হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতি জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি কখনো নিজের ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারকে লক্ষ্য বানাননি। তিনি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন চরিত্র, প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও দয়ার মাধ্যমে। তাঁর আহ্বান ছিল আল্লাহর দিকে, নিজের দিকে নয়।
কিন্তু আজ ধর্মীয় অঙ্গনের একটি অংশে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি উদ্বেগজনকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। বক্তার অনুসারী সংখ্যা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং এবং অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ফলে ধর্মের চেয়ে ব্যক্তি বেশি আলোচিত হচ্ছে।
প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (রহ.) সতর্ক করে বলেছেন, যখন দ্বীনি জ্ঞান আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে দুনিয়াবি সম্মান, নেতৃত্ব ও সম্পদ অর্জনের মাধ্যম হয়ে যায়, তখন তা ভয়াবহ ফিতনার রূপ নেয়। তাঁর মতে, ইলমের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হলো ইলমকে দুনিয়া অর্জনের সিঁড়ি বানানো।
বর্তমানে ওয়াজ-মাহফিলের অর্থনীতি নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। বিপুল সম্মানী, শর্তসাপেক্ষ অংশগ্রহণ, প্রচারণাভিত্তিক আয়োজন এবং তারকাকেন্দ্রিক মাহফিল সংস্কৃতি অনেকের মনে এই ধারণা তৈরি করেছে যে ধর্মীয় মঞ্চ ধীরে ধীরে একটি শিল্পে পরিণত হচ্ছে। ইসলাম আলেমদের জীবিকা অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি, তবে দ্বীনকে পার্থিব স্বার্থের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না।” (সূরা আল-বাকারা: ৪১)
ধর্মীয় অঙ্গনের আরেকটি বড় সংকট হলো যোগ্যতার অবক্ষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে গভীর জ্ঞান ছাড়াই কেউ রাতারাতি জনপ্রিয় বক্তায় পরিণত হতে পারেন। ফলে ভুল তথ্য, দুর্বল বর্ণনা, জাল হাদিস এবং বিকৃত ইতিহাসের প্রচারও বেড়ে যাচ্ছে।
ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) বলতেন, যে ব্যক্তি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়, সে মূলত নিজের অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে।
কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেকেই এমনভাবে কথা বলেন যেন ইসলামের সব বিষয়ে তাদের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে। এটি জ্ঞানচর্চার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রবণতা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে মাহফিলের মঞ্চ মুসলিম সমাজে ঐক্যের পরিবর্তে বিভক্তি সৃষ্টি করছে। এক আলেম আরেক আলেমকে আক্রমণ করছেন, এক দল অন্য দলকে বিদ্রূপ করছে, মতভেদ রূপ নিচ্ছে ব্যক্তিগত শত্রুতায়। অথচ কুরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে, “তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে।” (সূরা আল-আনফাল: ৪৬)
বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ইসলামকে ভালোবাসে। তারা আলেমদের সম্মান করে, মাহফিলে অংশ নেয় এবং ধর্মীয় আলোচনা মনোযোগ দিয়ে শোনে। এই ভালোবাসা ও আবেগ একটি অমূল্য সম্পদ। কিন্তু সেই আবেগ যদি ব্যক্তিগত প্রভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতার উপকরণে পরিণত হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে ইসলামের ভাবমূর্তির।
ইসলামকে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু ইসলামবিদ্বেষীদের মোকাবিলা করা নয়; ইসলামের নামে সংঘটিত বিকৃতি, অতিরঞ্জন, অজ্ঞতা ও আত্মস্বার্থকেও চিহ্নিত করা। নববী দাওয়াত ছিল বিনয়, প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও চরিত্রের দাওয়াত। সেই দাওয়াতকে যদি ইউটিউবের ভিউ, ভাইরাল ক্লিপ কিংবা মাইক্রোফোনের উচ্চতায় সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য আড়াল হয়ে যাবে।
আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু বেশি আলেম নয়; প্রয়োজন দায়বদ্ধ আলেম। প্রয়োজন শুধু বেশি বক্তা নয়; প্রয়োজন সৎ, প্রজ্ঞাবান ও আমলনিষ্ঠ দায়ী। প্রয়োজন শুধু বেশি মাহফিল নয়; প্রয়োজন নববী আদর্শের চর্চা। কারণ ইসলাম কখনো শব্দের শক্তিতে বিজয়ী হয়নি; বিজয়ী হয়েছে সত্য, জ্ঞান, আমল ও উত্তম চরিত্রের শক্তিতে।
লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।
মন্তব্য করুন