নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ।
মৃত্যু এমন এক চূড়ান্ত সত্য, যা থেকে পৃথিবীর কোনো মানুষই রেহাই পাবে না। প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যুর পর মানুষের জীবনের প্রথম ধাপ হলো কবর, আর কবর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘আলমে বারযাখ’। ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, কবরই আখিরাতের প্রথম পরীক্ষা। যে ব্যক্তি এখানে সফল হবে, তার জন্য পরবর্তী ধাপগুলো সহজ হবে। আর যে ব্যর্থ হবে, তার জন্য পরবর্তী ধাপগুলো হবে আরও কঠিন।
হজরত উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কবর হলো আখিরাতের প্রথম ধাপ। যে ব্যক্তি কবরের আজাব থেকে মুক্তি পাবে, তার জন্য পরবর্তী ধাপগুলো সহজ হবে। আর যে মুক্তি পাবে না, তার জন্য পরবর্তী ধাপগুলো আরও কঠিন হবে।” (তিরমিজি: ২৩০৮)
ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, কারও কবর হবে জান্নাতের একটি বাগান, আবার কারও কবর হবে জাহান্নামের একটি গর্ত। কবরের আজাব কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। কবরের চাপ, সাপ-বিচ্ছুর দংশন, ফেরেশতাদের কঠিন শাস্তি এবং অন্যান্য ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বিভিন্ন হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। (তিরমিজি: ২৪৬০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমি কবরের চেয়ে অধিক ভয়ঙ্কর কোনো দৃশ্য দেখিনি।” (ইবনে মাজাহ: ৪২৬৭)
তাই তিনি উম্মতকে নিয়মিত কবরের আজাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। (তিরমিজি: ৩৪০৪)
কবরে প্রথম প্রশ্ন হবে, ‘মান রাব্বুকা’—তোমার রব কে?
এ প্রশ্নের উত্তর মুখে জানা থাকলেই যথেষ্ট নয়। যারা দুনিয়ার জীবনে একমাত্র আল্লাহকে রব হিসেবে মেনে চলেছে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করেনি, তারাই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হবে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তারা তাদের ধর্মীয় পণ্ডিত ও সন্ন্যাসীদের আল্লাহকে বাদ দিয়ে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।” (সুরা তাওবা: ৩১)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তারা তাদের আলেমদের হালাল-হারামের সিদ্ধান্তকে আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে অনুসরণ করত। এটিই তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করার শামিল। (তাফসির ইবনে কাসির)
কবরে দ্বিতীয় প্রশ্ন হবে, ‘মা দীনুকা’—তোমার দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা কী?
যারা জীবনের সব ক্ষেত্রে ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারাই বলতে পারবে, “দীনিয়াল ইসলাম”।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মনোনীত দ্বীন হলো ইসলাম।” (সুরা আলে ইমরান: ১৯)
আবার তিনি বলেন,
“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তা কখনো গ্রহণ করা হবে না।” (সুরা আলে ইমরান: ৮৫)
কবরে সর্বশেষ প্রশ্ন হবে, ‘মান নাবিয়্যুকা’—তোমার নবী কে?
যারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ, সুন্নাহ ও শিক্ষা অনুসরণ করে জীবন পরিচালনা করেছে, তারাই এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে।
অন্যদিকে, যারা জীবনের আদর্শ হিসেবে অন্যদের অনুসরণ করেছে এবং রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে দূরে সরে গেছে, তাদের পক্ষে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন হবে।
কবরের তিনটি প্রশ্নের উত্তর শুধু মুখস্থ করলেই হবে না। দুনিয়ার জীবনে তাওহিদের ওপর অবিচল থাকা, ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই এ প্রশ্নগুলোর প্রকৃত প্রস্তুতি।
হাদিসে এসেছে, যারা এসব বিষয়ে দুনিয়াতে আমল করবে, আল্লাহ তাআলাই কবরে তাদের জবানকে সত্য উত্তরের জন্য দৃঢ় করে দেবেন। আর যারা তা করেনি, তারা শুধু বলবে, “লা আদরি”—আমি জানি না। (মুসতাদরাক আল-হাকিম: ১০৭)
সুতরাং কবরের ফিতনা ও আখিরাতের কঠিন পরীক্ষা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের উচিত একমাত্র আল্লাহকে রব হিসেবে মেনে চলা, জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের বিধান অনুসরণ করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে নিজের জীবনাচরণের অংশ করে নেওয়া।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করে সে অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি; সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট; সাবেক প্রধান শিক্ষক, তৈয়ব কামাল হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদ্রাসা; সাবেক প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।
মন্তব্য করুন