৪ আগস্ট ২০২৪, বা ৩৫ জুলাই—দিনটি আমার জীবনের এমন এক স্মৃতি, যা কোনো দিন ভুলে যাওয়ার নয়।
সেদিন মাগুরাসহ সারা দেশ ছিল টালমাটাল। আগের দিনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল, পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য মাগুরা শহরের ভায়না মোড় এলাকায় যেতে হবে।
ফজরের নামাজ আদায় করেই ভায়না মোড়ের উদ্দেশে ছুটে যাই। তখনো তেমন কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চোখে পড়েনি। সকাল ৯টার দিকে আবার ভায়না মোড়ে পৌঁছাই। তখনও চারপাশ ছিল অনেকটাই শান্ত। মনে হচ্ছিল, যেন আমিই সবার আগে সেখানে উপস্থিত হয়েছি।
সকাল সোয়া ৯টার দিকে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যেতে শুরু করে। আমি ভায়না মোড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক ব্যক্তি আমাকে লক্ষ্য করে আধলা ইট ছুড়ে মারেন। ইটটি আমার বাম পায়ের হাঁটুর ওপরের অংশে, অর্থাৎ উরুতে সজোরে আঘাত করে।
পরে আমার কয়েকজন সহকর্মী ভায়না মোড়ের ঠিক উত্তর পাশে অবস্থান নিলে আমিও সেখানে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে থাকি। এ সময় ছবি ও ভিডিও ধারণ করাকে কেন্দ্র করে একাধিকবার আমার ওপর হামলার চেষ্টা করা হয়। তবে সহকর্মীদের সহযোগিতায় সেসব হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়।
এরই মধ্যে খবর আসে, ছাত্রনেতা মেহেদী হাসান রাব্বি ও ফরহাদ হোসেন শাহাদত বরণ করেছেন। পরিস্থিতি তখন আরও ভারী ও বেদনাবিধুর হয়ে ওঠে।
ঘটনার পর আমি হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে শ্রীপুরে ব্যক্তিগতভাবে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিই। চিকিৎসক বাইরে থেকে উন্নতমানের একটি স্প্রে এনে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। সেই স্প্রে এবং ‘মুভ’ এখনো ব্যবহার করছি। কিন্তু ঘটনার প্রায় দুই বছর পার হতে চললেও আমি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারিনি।
এখনো বাম কাতে শুতে পারি না। ‘হাই কমোড’ ছাড়া বাথরুম ব্যবহার করতেও কষ্ট হয়। জানি না, আর কত দিন এভাবে চলতে হবে। তবুও মহান আল্লাহর কাছে সুস্থতা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য প্রতিনিয়ত দোয়া করি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও আমার পরিবারের পাঁচ থেকে ছয়জন সদস্য শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আমার দুই বোন, দুই ভাগনি, এক ভাগিনা ও এক চাচা। বোন ও ভাগনিদের শাহাদত বরণের খবর শুনে আমার দুলাভাইও হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
এত বড় শোক ও বেদনার ইতিহাস বুকে ধারণ করেও মহান রব্বুল আলামিনের কাছে লক্ষ-কোটি শুকরিয়া আদায় করি—আলহামদুলিল্লাহ। অনেক মানুষের তুলনায় এখনো ভালো আছি, আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।
সবার কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া চাই, মহান রব্বুল আলামিন যেন আমাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করেন এবং সুস্থভাবে মানুষের কল্যাণে ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে কাজ করার তাওফিক দেন।
মহান আল্লাহ যেন ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের শহীদসহ সকল শহীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং তাঁদের জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান দান করেন।
মন্তব্য করুন